রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় নতুন করে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলাকে সংক্রমণের অন্যতম হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত এক মাসে রংপুর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৫৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে রংপুর ও দিনাজপুরের ১৬ জনের অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আর সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭ জন।
স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ অসুস্থ গরুর মাংস খাওয়া অথবা গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির সময় পশুর রক্ত ও শরীরের তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এসেছেন। সুন্দরগঞ্জ ও পাশের রংপুরের পীরগাছায় আক্রান্তদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবাদিপশুর বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে পালন করা হয়েছিল। গত বছরও একই সময়ে এসব এলাকায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল।
এবার সুন্দরগঞ্জে পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অসুস্থ গরু জবাই করে তার মাংস মানুষের মধ্যে বিতরণের ঘটনা। ১১ সেপ্টেম্বর উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটি গ্রামের একটি অসুস্থ গরু জবাই করা হয়। পরে গরুটির মাংস প্রায় ১০০ পরিবারের মধ্যে কম দামে বিক্রি ও বিতরণ করা হয় বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য থেকে জানা গেছে।
এর কয়েক দিন পর থেকেই ওই এলাকায় একের পর এক মানুষের শরীরে জ্বর ও ত্বকে ফোসকার মতো উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। আক্রান্তদের কেউ ওই গরুর মাংস খেয়েছেন, আবার কেউ জবাই ও মাংস কাটার সময় সরাসরি সংস্পর্শে এসেছেন।
ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় মাংসের নমুনা পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর। ২১ সেপ্টেম্বর বাছহাটি গ্রাম থেকে দুটি মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে (সিডিআইএল) পাঠায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর। ২৩ সেপ্টেম্বর পাওয়া পরীক্ষার প্রতিবেদনে দুটি নমুনাতেই অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হয় বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম।
এদিকে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের ছয় বাসিন্দার মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামরুল হাসানের তথ্য অনুযায়ী, অসুস্থ গরুর মাংস খাওয়ার পর তাদের জ্বর ও ত্বকে ফোসকা দেখা দেয়। চিকিৎসার পর তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ওই ছয়জনের মধ্যে চারজনের নমুনায় অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল বলে তিনি জানান।
বাছহাটি গ্রামের গোলেজা বেগম জানান, অসুস্থ গরুটির মাংস পরিষ্কার করে রান্না করে খাওয়ার পর তার হাতে ফোসকা দেখা দেয়। একই গ্রামের শফিক আলম ওই মাংস খাননি। তবে গরু জবাইয়ে সহযোগিতা করার সময় পশুটির রক্ত তার হাতে লাগে। পরে তার দুই হাতেও ফোসকা দেখা দেয়।
সুন্দরগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও সংক্রমণের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার চাওলা ইউনিয়নের আদমপাড়া গ্রামে ২২ সেপ্টেম্বর ১৩ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। তাদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন ছিলেন। রংপুরের সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা জানান, আক্রান্তরা পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের সংশ্লিষ্ট গরুটিও সুন্দরগঞ্জ থেকে কেনা হয়েছিল।
এর আগে ২৯ আগস্ট পীরগাছায় পালন করা একটি গরুর মাংস খাওয়ার পর এক সেনাসদস্য ও তাঁর বাবা-মায়ের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। পরে তারা খোলাহাটি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ছাড়পত্র পান।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ২৪ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জে যায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট—আইইডিসিআরের ছয় সদস্যের একটি দল এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) দুই গবেষক। তারা আক্রান্তদের পরিস্থিতি পর্যালোচনা, নমুনা সংগ্রহ এবং সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস নিয়ে কাজ করেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অসুস্থ বা সন্দেহজনক পশু জবাই করাই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম ঝুঁকি। ফলে কোনো গবাদিপশু অসুস্থ হলে সেটি জবাই না করে প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাধ্যমে পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন পশুর মাংস খাওয়া এবং জবাই বা মাংস কাটার সময় সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতেও বলা হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি জানান, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং, প্রশাসনিক সভা এবং কসাইদের সঙ্গে বৈঠক করে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মসজিদের ইমামদের মাধ্যমেও গ্রামবাসীকে অসুস্থ পশু জবাই না করা এবং সন্দেহজনক পশুর মাংস না খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
তবে অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে গবাদিপশুর টিকাদান নিয়ে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরগঞ্জে প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাবের পর চলতি বছরের জুলাইয়ে উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে রিং ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি শুরু করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার গরুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ উপজেলায় থাকা মোট গবাদিপশুর তুলনায় টিকাদানের আওতায় আসা পশুর সংখ্যা এখনও তুলনামূলকভাবে কম। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, আক্রান্ত এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সব গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনার কথা। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের কাছে আরও ১১ হাজার টিকা মজুত রয়েছে। পাশাপাশি ১৫ হাজার অতিরিক্ত টিকার জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে কাজ করা আইসিডিডিআর,বি ও আইইডিসিআরের গবেষকেরা শুধু গরু নয়, ছাগল, ভেড়া ও মহিষকেও অ্যানথ্রাক্সের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ এসব প্রাণীর মাধ্যমেও মানুষের মধ্যে রোগটি ছড়াতে পারে।
এর আগে সুন্দরগঞ্জে ছাগল থেকেও মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। গত বছরের ৫ অক্টোবর পশ্চিম বেলকা গ্রামের রোজিনা বেগম নামের এক নারী অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি অসুস্থ ছাগলের মাংস পরিষ্কার, রান্না ও খাওয়ার পর তাঁর আঙুলে ফোসকা দেখা দিয়েছিল। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর অন্য কিছু শারীরিক জটিলতার কথাও বলা হয়েছিল।
গরুর বাইরে অন্যান্য গবাদিপশুকে টিকাদানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না কেন—এ বিষয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. জোবাইদুল কবীর জানান, এই অঞ্চলে অতীতে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব মূলত গরু থেকে শুরু হওয়ায় বর্তমানে গরুকে টিকাদানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে ছাগল, ভেড়া ও মহিষসহ অন্যান্য গবাদিপশুর অবস্থার ওপরও নজর রাখা হচ্ছে।
অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণত জ্বর ও ত্বকে ফোসকা বা ক্ষত দেখা দিতে পারে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, আক্রান্ত গবাদিপশুর রক্ত, মাংস বা শরীরের অন্যান্য তরলের সংস্পর্শে মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
সুন্দরগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করা। অসুস্থ পশু জবাই ও মাংস বিক্রি বন্ধের পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকার গবাদিপশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের শনাক্তকরণ জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গত বছরের প্রাদুর্ভাবের পর নেওয়া প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ এবার শুধু একজন বা দুজনের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা নয়; একটি অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস বণ্টনের পর একাধিক ইউনিয়নে মানুষের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী পীরগাছাতেও সংক্রমণের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। ফলে সুন্দরগঞ্জের পরিস্থিতি এখন স্থানীয় একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।