১৯৫০-এর দশকে ভারত ছিল একটি তরুণ রাষ্ট্র, যা তার ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করছিল। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছিল, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রসারিত হচ্ছিল এবং দেশ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অবকাঠামো নির্মাণ করছিল।
জাতিসংঘও সেই যাত্রার একটি অংশ ছিল।
১৯৬৫ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বছর চারেক আগেই, জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা ভারতের বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত সক্ষমতা জোরদার করার প্রচেষ্টাগুলোকে সমর্থন জোগাচ্ছিল।
দেশের শুরুর দিকের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (IIT) প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ডিজিটাল শাসন এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিকাশ—ভারতের পরিবর্তনশীল অগ্রাধিকারের সাথে সাথে এই অংশীদারিত্বের পরিধিও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাতিসংঘ দিবসে, আমরা সেই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর দিকে ফিরে তাকাচ্ছি, যা এই দীর্ঘ যাত্রাকে একটি রূপ দিয়েছে।
১৯৫০-এর দশক: বৈজ্ঞানিক ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
ভারতের শুরুর দিকের উন্নয়নমূলক অগ্রাধিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেগুলো বিশ্বমানের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও গবেষক তৈরি করতে সক্ষম।
জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা ১৯৫০ সালে আইআইটি খড়গপুর এবং ১৯৫৮ সালে আইআইটি বোম্বে গঠনে ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটে, যা ভারতের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করেছে।
শিক্ষা ও গবেষণায় এই শুরুর দিকের বিনিয়োগই কয়েক দশকের উদ্ভাবনের ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিল।
১৯৬০-এর দশক: খনিজ তেল অনুসন্ধান থেকে স্যাটেলাইট যোগাযোগ
ভারত তার শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করার সাথে সাথে তাদের যৌথ সহযোগিতা শক্তি এবং যোগাযোগ খাতের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করে।
১৯৬৬ সালে অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশনের (ONGC) ইনস্টটিউট অব পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন-এ প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ তেল অনুসন্ধান সক্ষমতা জোরদার করা হয়।
এর এক বছর পর, ভারতের প্রথম ‘এক্সপেরিমেন্টাল স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন আর্থ স্টেশন’ (আহমেদাবাদে অবস্থিত) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে সহায়তা করা হয়।
উপগ্রহ-ভিত্তিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা বিকাশে এটি ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ; যা পরবর্তীতে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো একাধিক ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল।
১৯৭০-এর দশক: দুগ্ধ খাত, সম্প্রচার এবং পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের রূপান্তর
১৯৭০-এর দশক দৈনন্দিন জীবনকে স্পর্শ করে এমন সব আধুনিক ব্যবস্থার ওপর নতুন আলোকপাত করে।
ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সাথে কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে, ইউএনডিপি ‘অপারেশন ফ্লাড’ কর্মসূচিতে সহায়তা করে। এই কর্মসূচিটি ভারতের দুগ্ধ খাতকে আমূল বদলে দিতে এবং দেশজুড়ে দুধের সরবরাহ শৃঙ্খলকে জোরদার করতে সাহায্য করেছিল।
গণমাধ্যম ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে, পেশাদার সম্প্রচার দক্ষতা বাড়াতে ইউএনডিপি পুনের ‘ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’র বিকাশ ঘটায় এবং একটি নির্দিষ্ট টেলিভিশন প্রশিক্ষণ বিভাগ গঠনে সহায়তা করে।
এদিকে, ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টারকে সহায়তার মাধ্যমে জনপ্রশাসনে মেইনফ্রেম কম্পিউটিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়, যা ডিজিটাল শাসনের দিকে ভারতের যাত্রায় একটি প্রাথমিক মাইলফলক ছিল।
১৯৮০-এর দশক: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং গবেষকদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন
১৯৮০-এর দশকের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল।
ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সাথে ইউএনডিপির যৌথ কাজ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
১৯৮৬ সালে ইলেক্ট্রনিক্স বিভাগের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে ভারতের অগ্রগামী শিক্ষা ও গবেষণা নেটওয়ার্ক ‘ERNET’ গড়ে ওঠে, যা নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে অপরের সাথে যুক্ত করতে সাহায্য করে।
ভারত যখন আমদানিকৃত বীজের ব্যবহার বাড়াচ্ছিল, তখন কীটপতঙ্গ ও জীবাণুর হাত থেকে কৃষিকে রক্ষা করার জন্য উদ্ভিদ কোয়ারেন্টাইন স্টেশনগুলোকে শক্তিশালী করতেও ইউএনডিপি সহায়তা প্রদান করেছিল।
১৯৯০-এর দশক: উন্নয়নের কেন্দ্রে সাধারণ মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া
১৯৯০-এর দশকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গণ্ডি পেরিয়ে সার্বিক মানব উন্নয়নের মূল ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের সাথে কাজ করে ইউএনডিপি নীতি নির্ধারণে ‘মানব উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি’র ব্যবহার জোরদার করতে সাহায্য করে, যা মানুষের জীবনের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য জাতীয় ও রাজ্য-পর্যায়ের ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করে।
তৃণমূল পর্যায়ে, ‘দক্ষিণ এশিয়া দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি’ অন্ধ্রপ্রদেশের নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা প্রদান করেছিল, যা গ্রামীণ আর্থিক ও সামাজিক ব্যবস্থার জন্য পরবর্তীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
এছাড়াও এই সহযোগিতা হিমালয় অঞ্চলের রাজ্যগুলোর জন্য ক্লিন এনার্জি কৌশল, পাট খাতে গবেষণা ও বহুমুখীকরণ, ওষধি গাছের সংরক্ষণ এবং ‘অলিভ রিডলি’ সামুদ্রিক কাচ্ছপের পরিযাণ পথ বোঝার মতো বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রচেষ্টায় বিস্তৃত ছিল।
যার মূল লক্ষ্য ছিল—মানুষ, জীবিকা এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের ওপর ক্রমবর্ধমান জোর দেওয়া।
২০০০-এর দশক: অধিকার রক্ষা, স্থানীয় শাসন ও দুর্যোগ মেকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন
নতুন সহস্রাব্দে নাগরিক অধিকার, জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২০০৫ সালে ‘তথ্য জানার অধিকার আইন’ (Right to Information Act) চালুর পর, এই আইনটি কার্যকর করতে ইউএনডিপি সরকারি তথ্য কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মচারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
২০০৬ সাল থেকে, ‘মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন’ (MGNREGA) বাস্তবায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রককে কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়।
ইউএনডিপি ‘পঞ্চায়েতি রাজ’ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের সক্ষমতা তৈরিতেও কাজ করে এবং লিঙ্গভিত্তিক বাজেট (gender budgeting) প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভারত সরকারের সাথে যৌথভাবে কাজ করে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে, এই অংশীদারিত্ব রাজ্য-পর্যায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়দের নেতৃত্বাধীন পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে জোরদার করে, যা পুনর্গঠন কাজের মূল কেন্দ্রে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে স্থান দেয়।
সহযোগিতার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ছিল জীববৈচিত্র্য পরিকল্পনা, টেকসই গ্রামীণ পর্যটন, এইচআইভি-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ‘স্টেট অ্যাকশন প্ল্যান’।
২০১০-এর দশক: ডিজিটাল স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও জলবায়ু অর্থায়ন
২০১০-এর দশকে এই অংশীদারিত্ব ক্রমবর্ধমানভাবে প্রযুক্তি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বকে একসূত্রে বেঁধেছিল।
একটি অন্যতম বড় মাইলফলক ছিল ‘ইলেকট্রনিক ভ্যাকসিন ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক’ (eVIN)। টিকার মজুদ এবং কোল্ড-চেইনের তাপমাত্রা ডিজিটাল পদ্ধতিতে নজরদারির জন্য ইউএনডিপি এটি ডিজাইন ও বাস্তবায়ন করেছিল।
টিকা সরবরাহ শৃঙ্খলে নজরদারি উন্নত করার মাধ্যমে eVIN টিকাদান ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে সাহায্য করে এবং পরবর্তীতে কোভিড-১৯ প্রতিষেধক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রদান করে।
ইউএনডিপি রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার) ব্যক্তিদের অধিকার এগিয়ে নেওয়া, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ করা এবং ‘দিশা’ (Disha) কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের সুযোগ সম্প্রসারণে সহায়তা করেছিল—যা দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে নতুন দিক উন্মোচন করে।
পরিবেশগত দিক থেকে, ২০১৫ সালে ভারতে চালু হওয়া ‘বায়োডাইভারসিটি ফাইন্যান্স ইনিশিয়েটিভ’ (BIOFIN) অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন এবং জাতীয় জীববৈচিত্র্য অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
শিল্পক্ষেত্র এবং ভারতীয় রেলওয়েতে জ্বালানি দক্ষতার (energy efficiency) ওপর কাজটি দর্শিয়েছিল যে কীভাবে পরিবেশগত স্থায়িত্বকে প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলোর সাথে সমন্বিত করা যেতে পারে।
২০২০-এর দশক: সংকট মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ
কোভিড-১৯ যখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল, তখন ইউএনডিপি ডিজিটাল ভ্যাকসিন লজিস্টিকস এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন ব্যবস্থার সহায়তার মাধ্যমে ভারতের মহামারি মোকাবিলা প্রচেষ্টায় পাশে দাঁড়িয়েছিল।
এই অংশীদারিত্ব কোভিড-১৯ টিকাদানের জন্য ‘CoWIN’ এবং পরবর্তীতে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ডিজিটাল ব্যবস্থা জোরদার করতে দেশব্যাপী ‘U-WIN’ চালুর কাজে সহায়তা করেছিল।
মহামারির সংকটের বাইরেও, রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’কে (SDGs) পরিমাপযোগ্য অগ্রগতিতে রূপান্তর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ইউএনডিপি-সমর্থিত এসডিজি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় সংক্রান্ত মডেলগুলো উপাত্ত-ভিত্তিক (data-driven) পরিকল্পনা এবং স্থানীয় পদক্ষেপগুলোকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য, মরুকরণ এবং ওজন স্তর রক্ষাসহ ভারতের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নেও এই অংশীদারিত্ব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
তৃণমূল পর্যায়ে, সরকারি সহযোগীদের সাথে এই যৌথ কাজ আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার ও জীবিকা জোরদার করা, শস্য বিমার মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকদের সাহায্য করা এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের (sanitation workers) সামাজিক সুরক্ষা উন্নত করার ওপর আলোকপাত করে।
জনস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে জলবায়ু সহনশীলতা—এই দীর্ঘযাত্রার মূল লক্ষ্যই হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারে।