কানাডার সাসকাচুয়ান প্রদেশে এক বাংলাদেশি নারীকে মানবপাচার ও ধর্ষণের দায়ে দুই বাংলাদেশিকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তাঁদের মধ্যে মো. মাসুমকে ১৪ বছর এবং সোহেল হায়দারকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর বকেয়া মজুরি পরিশোধেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
কানাডার সংবাদমাধ্যম সিবিসি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি চলতি বছরের শুরুর দিকে মানবপাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। বৃহস্পতিবার সাসকাচুয়ানের প্রাদেশিক আদালতে তাঁদের সাজা ঘোষণা করা হয়।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মাসুমকে ভুক্তভোগী নারীর বকেয়া মজুরি বাবদ ১২ হাজার ২৬৮ কানাডীয় ডলার পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে মানবপাচারে জড়িত থাকার দায়ে সোহেল হায়দারকে চার বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫ হাজার ৮৮৫ কানাডীয় ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ভুক্তভোগী নারী বলেন, ঘটনার পরও তিনি তীব্র ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছে। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘আমি ওদের ভুলতে পারি না। তারা আমার স্বপ্ন ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে। তারা আমার সম্মান, আমার ভবিষ্যৎ, আমার পরিবার এবং আমার ক্যারিয়ার—সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।’ওই নারী আরও জানান, কানাডায় তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে তাঁর এলাকায় নানা গুঞ্জন ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাঁর পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং ভাইবোনদের ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি আদালতকে জানান।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় যাওয়ার পর ওই নারীকে মাসুম ও সোহেল তাঁদের রেস্তোরাঁয় কাজ দেন। পরে কাজের অনুমতিপত্র বাতিল করে দেওয়া এবং পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁকে জিম্মি করে রাখেন তাঁরা। এই ভয় দেখিয়ে ওই নারীকে সপ্তাহের প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা করে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কিন্তু তাঁকে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না। এ ছাড়া তাঁকে একটি স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার বেজমেন্টে আটকে রাখা হয়েছিল। মামলায় মাসুমের বিরুদ্ধে ওই নারীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগও আনা হয়। আদালতে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারিক কার্যক্রম চলে।
পরে স্থানীয় দুই রাজনীতিক ও একজন অভিবাসনকর্মীর সহায়তায় ওই নারী উদ্ধার হন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে সাসকাচুয়ান রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ মাসুম ও সোহেলকে গ্রেপ্তার করে। এরপর প্রায় ১৮ মাসের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়।
আদালতে ভুক্তভোগীর জবানবন্দিতে উঠে আসা বর্ণনা অনুযায়ী, শোষণ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সাজা ঘোষণার মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো।