যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ আট মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান এবং ভেঙে পড়া যুদ্ধবিরতি পুনরুজ্জীবিত করতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই চুক্তিতে ইরান যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইরানের চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। বরং তেহরান ও চুক্তির তিন সদস্যদেশের মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়ে ইসলামাবাদ ‘সাবধানী আশাবাদী’। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ভাষায় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। যেসব দেশ সম্মিলিত প্রতিরোধ ও আঞ্চলিক শান্তির অভিন্ন লক্ষ্য ধারণ করে, তাদের স্বাগত জানানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে চুক্তির তিন সদস্যদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে।
চৌধুরীর বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে আঞ্চলিক দেশগুলো উদ্যোগী হয়েছে, অন্যদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানকে আলোচনার বাইরে না রেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তেহরানে কেন বারবার যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অক্টোবর মাসেই তিনি দুবার ইরানের রাজধানী তেহরান সফর করেছেন। সর্বশেষ সফরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন। ২৬ অক্টোবরের বৈঠকে ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্রের ভাষ্য, সেনাপ্রধানের বারবার তেহরান সফরকে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়। তবে তিনি আলোচনায় কী কী বিষয় উত্থাপিত হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি। যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। ফলে সফরগুলো থেকে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে পাকিস্তান আশাবাদী হলেও যুদ্ধবিরতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা সংঘাতের অবসানে কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ এখনো নেই।
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইরান শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সৌদি আরব ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তেহরান আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক দেশগুলোর হাতেই রাখার পক্ষে।
কী আছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে
সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্বাক্ষর করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তির মূল শর্ত হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর কথা রয়েছে।
চুক্তিটি তিন দেশের ভিন্ন ধরনের কৌশলগত সক্ষমতাকে একত্র করেছে। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল আর্থিক সম্পদ ও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও অস্ত্র উৎপাদনশিল্প। বিশ্লেষকদের মতে, এসব সক্ষমতা একত্র হলে সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে চুক্তিটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সামরিক জোট হিসেবে তুলে ধরেনি এর স্বাক্ষরকারীরা। সৌদি আরব জানিয়েছে, এটি কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক জোট নয় এবং রাজ্যটির বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের বিকল্পও নয়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও বলেছেন, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
ইরান যোগ দিলে কী পরিবর্তন হতে পারে
ইরান চুক্তিতে যুক্ত হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া দেশটিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একই নিরাপত্তা কাঠামোয় আনার উদ্যোগ সফল হলে পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনের একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস কমানোর ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সম্ভাব্য এই পরিবর্তনকে সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সংঘাতের পক্ষগুলোর প্রতি সমর্থন নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরোধও কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যস্থতায় সমাধান করা সম্ভব হবে কি না, তা অনিশ্চিত। চুক্তির তিন সদস্যদেশের মধ্যে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে রাজনৈতিক সম্মতি প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ইরানও এমন কোনো কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার আগে তার শর্ত, নিরাপত্তাগত দায়বদ্ধতা এবং নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিচার করবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চুক্তিতে নতুন সদস্য নেওয়ার সুযোগ থাকা আর ইরানের যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র সম্ভাবনার কথা বলেছেন; ইরানের পক্ষ থেকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে ইরান ও তিন সদস্যদেশের মধ্যে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য সহযোগিতার একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ইয়েমেনের উত্তেজনা আলোচনায় নতুন চাপ
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেন ঘিরে উত্তেজনাও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী এবং সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়েছে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে মক্কা চুক্তির গুরুত্বও বেড়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় ইসলামাবাদের অঙ্গীকার রয়েছে। তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে পাকিস্তান অংশ নয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা আরও মোতায়েন করা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এবং দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। অর্থাৎ চুক্তি থাকলেও সামরিক পদক্ষেপের ধরন ও পরিসর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত নয়।
সামনে কী
এ মুহূর্তে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয় কি না, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে কি না, এবং মক্কা চুক্তির সদস্যদেশগুলো ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো কতটা এগিয়ে নিতে পারে।
পাকিস্তানের ‘সাবধানী আশাবাদ’ কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও তা এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতার নিশ্চয়তা নয়। ইরানকে মক্কা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখতে হবে। তবে তেহরানে চার দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগের গুরুত্ব সামনে এনেছে।