এলচেকে উড়িয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু হান্সি ফ্লিকের দলের, রাফিনিয়া-ফের্মিনের জোড়া গোল, অভিষেকেই গোল আডেইয়েমির
নতুন মৌসুমে নিজেদের প্রথম লা লিগা ম্যাচেই শক্তির জানান দিল বার্সেলোনা। ঘরের মাঠের বাইরে এলচেকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করেছে গত দুই মৌসুমের চ্যাম্পিয়নরা। রাফিনিয়া ও ফের্মিন লোপেস করেছেন জোড়া গোল। অভিষেকেই জালের দেখা পেয়েছেন জার্মান ফরোয়ার্ড কারিম আডেইয়েমি। আর বদলি হিসেবে নেমে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোলে সহায়তা করে নজর কেড়েছেন আরেক নতুন মুখ অ্যান্থনি গর্ডন।
বিশ্বকাপের কারণে বার্সেলোনার লা লিগা অভিযান অন্য দলগুলোর চেয়ে এক সপ্তাহ পরে শুরু হয়েছে। সূচি অনুযায়ী ২৩ আগস্ট এলচের মাঠে ম্যাচটি ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা হলেও বার্সেলোনার জন্য এটি ছিল মৌসুমের প্রথম লিগ ম্যাচ।
মার্টিনেস ভালেরো স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখল ও আক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করে বার্সেলোনা। তবে প্রথম গোলের জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি তাদের। রাফিনিয়াকে বক্সের মধ্যে ফাউল করা হলে পেনাল্টি পায় বার্সা। স্পট কিক থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।
রাফিনিয়ার গোলের পরও বার্সেলোনা আক্রমণের ধার কমায়নি। এলচে চেষ্টা করছিল উঁচু প্রেসিংয়ের মাধ্যমে বার্সেলোনার বিল্ডআপে চাপ সৃষ্টি করতে। কিন্তু কাতালান দলটি দ্রুত পাস ও আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অবস্থান বদলের মাধ্যমে সেই চাপ সামলে নেয়।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ব্যবধান দ্বিগুণ করে বার্সেলোনা। রাফিনিয়ার পাস থেকে বল পেয়ে অভিষেকেই নিজের প্রথম অফিসিয়াল বার্সেলোনা গোল করেন আডেইয়েমি। প্রাক-মৌসুমে ভালো পারফরম্যান্সের পর এবার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেও গোল করে কোচ হান্সি ফ্লিকের আস্থার প্রতিদান দেন জার্মান ফরোয়ার্ড।
বার্সেলোনার জন্য প্রথমার্ধের আনন্দের মাঝেও কিছুটা অস্বস্তি ছিল গাভিকে নিয়ে। এলচের ভিক্টর চুস্তের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ডান পায়ে চোট অনুভব করেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। মাঠে কিছুক্ষণ থাকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে তুলে নিতে হয়। তাঁর জায়গায় মাঠে নামেন পেদ্রি। চোটের প্রকৃত অবস্থা জানতে পরবর্তী মেডিকেল পরীক্ষার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে বার্সাকে।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় বার্সেলোনা। এলচে বল দখলের চেষ্টা করলেও বার্সার রক্ষণে বড় ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারেনি। গোলের ব্যবধান বাড়ানোর পাশাপাশি ফ্লিক বেঞ্চের খেলোয়াড়দেরও ব্যবহার করেন।
আর সেখানেই ম্যাচের অন্যতম বড় পার্থক্য তৈরি করেন অ্যান্থনি গর্ডন। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইংলিশ উইঙ্গার তাঁর গতি ও আক্রমণাত্মক দৌড় দিয়ে এলচের রক্ষণকে সমস্যায় ফেলেন। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রাফিনিয়া ও ফের্মিন লোপেসকে দিয়ে দুটি গোল করান তিনি।
রাফিনিয়ার দ্বিতীয় গোলের পর বার্সেলোনার ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-০। এরপর ফের্মিন লোপেসের জোড়া গোলে স্কোরলাইন হয় ৫-০। দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক আক্রমণের মুখে এলচের রক্ষণ কার্যত ভেঙে পড়ে।
ফের্মিনের দুটি গোলই দেখিয়েছে, বার্সেলোনার আক্রমণভাগে এবার শুধু একজন নির্ভরযোগ্য ‘নম্বর নাইন’-এর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। রাফিনিয়া, ফের্মিন, আডেইয়েমি ও গর্ডনের মতো গতিশীল খেলোয়াড়দের দিয়ে ফ্লিক আক্রমণভাগকে আরও নমনীয় করে তুলতে চাইছেন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মুন্দো দেপোর্তিভোও ম্যাচটিকে ‘নম্বর নাইন ছাড়াই গোলের উৎসব’ হিসেবে দেখেছে।
এবারের মৌসুমের আগে বার্সেলোনার আক্রমণভাগ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। রবার্ট লেভানডফস্কি, ফেরান তোরেস ও মার্কাস রাশফোর্ডের বিদায়ের পর দলের সামনে ছিল একজন নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকারের ঘাটতি। জুলিয়ান আলভারেজকে দলে আনার চেষ্টাও সফল হয়নি। ফলে ফ্লিককে বিকল্প কৌশল নিয়ে এগোতে হচ্ছে। ম্যাচের আগে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস জানিয়েছিল, রাফিনিয়া, দানি ওলমো, গর্ডন ও আডেইয়েমিকে প্রয়োজনে ‘ফলস নাইন’ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন ফ্লিক।
এলচের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই সেই কৌশলের কার্যকারিতা দেখা গেল। রাফিনিয়া শুধু দুই গোলই করেননি, একটি গোলে সহায়তাও করেছেন এবং পেনাল্টিও আদায় করেছেন। অন্যদিকে ফের্মিন দ্বিতীয়ার্ধে জোড়া গোল করে দলের বড় জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে ম্যাচসেরার আলোচনায় রাফিনিয়ার নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হলেও বার্সেলোনার সামগ্রিক পারফরম্যান্স ছিল দলীয় সাফল্যের উদাহরণ।
নতুন মৌসুমে বার্সেলোনার আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো স্কোয়াডের গভীরতা। গর্ডন ও আডেইয়েমির মতো নতুন খেলোয়াড়রা প্রথম ম্যাচেই প্রভাব ফেলেছেন। অন্যদিকে রড্রি এখনো দলের সঙ্গে পুরোপুরি অনুশীলনে যোগ দিতে না পারায় এলচের বিপক্ষে খেলেননি। কয়েকজন খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও ক্লাবের ভেতরে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সব মিলিয়ে এলচের বিপক্ষে ৫-০ জয় শুধু তিন পয়েন্টের বেশি কিছু। লিগ শিরোপা ধরে রাখার অভিযানের শুরুতেই ফ্লিক দেখিয়ে দিলেন, আক্রমণভাগে একজন নির্দিষ্ট স্ট্রাইকার না থাকলেও তাঁর হাতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট বিকল্প রয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণেও বারবার উঠে এসেছে বার্সেলোনার আক্রমণভাগের বৈচিত্র্য ও বেঞ্চের কার্যকারিতার বিষয়টি।
আর বার্সেলোনার সামনে এখন আরও কঠিন পরীক্ষা। এলচের বিপক্ষে বড় জয় দিয়ে মৌসুম শুরু করার পর আগামী ম্যাচে ঘরের মাঠে অ্যাথলেটিক ক্লাবের মুখোমুখি হবে তারা। এরপর রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষেও ম্যাচ রয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই ফ্লিককে স্কোয়াডের গভীরতা, খেলোয়াড়দের ফিটনেস এবং নতুন আক্রমণভাগের সমন্বয় আরও ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
এক ম্যাচেই বার্সেলোনা অবশ্যই শিরোপার নিশ্চয়তা পায়নি। তবে ৫-০ জয়ের বার্তাটি পরিষ্কার—গত দুই মৌসুমের চ্যাম্পিয়নরা এবারও লা লিগার মুকুট ধরে রাখার লড়াইয়ে প্রস্তুত।