বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চললেও এখনো সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় সফরটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে দিল্লির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
ভারত অবশ্য সফরটি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ২১ আগস্ট দিল্লিতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এই মুহূর্তে তার কাছে জানানোর মতো কোনো তথ্য নেই। পরবর্তীতে কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে আগস্টের ২১ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে তারেক রহমানের ভারত সফর হতে পারে—এমন আলোচনা চললেও দুই দেশের কোনো সরকারই সফরের নির্দিষ্ট তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।
সফরের সম্ভাবনা যখন আলোচনায়, তখন ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দিল্লি অবশ্য জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
এর মধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে। ঢাকার মতে, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে এমন কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের পথে যেতে হবে, যা বর্তমানে পারস্পরিক আস্থার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। তবে ২২ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মৌলিক নীতি হিসেবে ‘পারস্পরিক স্বার্থের’ কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একতরফা স্বার্থের ভিত্তিতে টেকসই হতে পারে না। দুই পক্ষের স্বার্থকে সমানভাবে বিবেচনায় নিয়েই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, ভারত সফর নিয়ে ঢাকার কোনো তাড়াহুড়া নেই। নতুন সরকার নিয়ে ভারতের অবস্থান এবং দিল্লি কী ধরনের সম্পর্ক চায়, বাংলাদেশ সেটিও বোঝার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটিই বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অস্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে সেখানে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি এবং ভারতের অবস্থান—দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুই নয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বেড়া নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকার অসন্তোষ রয়েছে। সীমান্তে প্রাণহানি, অনিবন্ধিত অভিবাসন এবং ভারত থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও দুই দেশের আলোচনায় নিয়মিতভাবে উঠে আসছে।
বিশেষ করে ভারত যাদের অনিবন্ধিত বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যথাযথ কূটনৈতিক যাচাই হচ্ছে কি না, তা নিয়েও বাংলাদেশের আপত্তি রয়েছে। ঢাকার অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই মানুষকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ঢাকা। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
এই পরিবর্তিত অবস্থান দিল্লির জন্যও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেছে। নতুন সরকার এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও সেটিকে আরও বেশি সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সাজাতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের ভারত সফর বিলম্বিত বা স্থগিত হওয়া মানেই দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। বাংলাদেশ ও ভারত ভৌগোলিকভাবে পরস্পরের প্রতিবেশী এবং অর্থনীতি, বাণিজ্য, নদী, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের মতো বহু বিষয়ে তাদের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।
তবে সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে হলে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতি না হলে কেবল শীর্ষ পর্যায়ের সফর দিয়ে সম্পর্কের বরফ গলানো কঠিন হতে পারে।
ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এখন শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফর নয়; বরং এটি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন ভিত্তিতে এগোবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সফরের তারিখ কবে নির্ধারিত হবে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দিল্লির অবস্থান কী হবে এবং দুই দেশ পারস্পরিক স্বার্থের জায়গায় কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।