ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে যখন একের পর এক আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থা ও তারকা খেলোয়াড়দের অবস্থান কঠোর হচ্ছে, তখন ঠিক উল্টো সুর তুলেছেন আফ্রিকান ফুটবলের কিংবদন্তি স্যামুয়েল ইতো। ক্যামেরুন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি প্রকাশ্যেই ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে যে সমালোচনা হচ্ছে, তার বড় কারণ আসন্ন নির্বাচন।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফিফার একটি বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা। প্রস্তাবটি ছিল ফিফার নতুন একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার। পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত ব্যাপক বিরোধিতার মুখে প্রত্যাহার করা হলেও এর প্রভাব থামেনি। বরং ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল প্রশাসনের একটি অংশ এখন ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইতো বলেন, তিনি মনে করেন না ইনফান্তিনো কোনো ভুল করেছেন। তার মতে, সামনে ফিফা নির্বাচন থাকায় বর্তমান বিতর্ককে অনেকটাই রাজনৈতিকভাবে দেখা হচ্ছে। ইতো মনে করেন, প্রস্তাবটি ২১১ সদস্যের ফিফার মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল।
ইতোর অবস্থানের পেছনে আফ্রিকান ফুটবলের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। তার যুক্তি, বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল অর্থ এলে তুলনামূলক দরিদ্র ফুটবল দেশগুলো অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও প্রতিভা উন্নয়নে বড় সুবিধা পেত। ফলে আফ্রিকার দেশগুলো ইউরোপের বড় ফুটবল শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে যেতে পারত।
ইতো বিশেষ করে আফ্রিকায় নতুন মেসি বা এমবাপ্পে তৈরির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যের মূল যুক্তি হলো—আফ্রিকার প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা যেন সুযোগ ও অবকাঠামোর অভাবে অন্য দেশের হয়ে খেলতে বাধ্য না হন।
সমালোচকদের প্রধান আপত্তি অর্থের পরিমাণ নয়, ফুটবলের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিকভাবে কার হাতে যাবে—সেটি।
ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসনের প্রধান আলেকসান্দার চেফেরিন স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারকথা, ফুটবল বা বিশ্বকাপ এমন কোনো সম্পদ নয়, যা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা যায়।
এশিয়ার এএফসি, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ এবং উয়েফার নেতৃত্বও ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ড নিয়ে আস্থার সংকটের কথা জানিয়েছে। ([Reuters][2])
ফিফার নেতৃত্বের ওপর চাপ আরও বাড়ে যখন বর্তমান ও সাবেক একদল ফুটবলার প্রকাশ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি জানান।
‘যথেষ্ট হয়েছে’—ফুটবলারদের বার্তা
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার ও ফিফার Players’ Voice Panel-এর সদস্য মিকায়েল সিলভেস্ত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে **‘Enough is enough!’ শিরোনামে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। এতে ইংল্যান্ডের লুসি ব্রোঞ্জ এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী ইমানুয়েল পেতিসহ আরও কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক ফুটবলার সমর্থন জানান।
তাদের অভিযোগ, ফিফার বর্তমান নেতৃত্ব ফুটবলের মৌলিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মতামত যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও তারা অভিযোগ করেন।
তারা শুধু কোনো একটি বাণিজ্যিক প্রস্তাব বাতিলের দাবি করেননি; বরং ফিফার নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি তুলেছেন।
এখানেই স্যামুয়েল ইতোর অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ইউরোপ ও অন্য কয়েকটি অঞ্চলে যখন বিরোধিতা বাড়ছে, আফ্রিকার ফুটবল প্রশাসনের বড় অংশ এখনো ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ধরে রেখেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনও ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং ২০২৭ সালের নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছে।
এমনকি ইনফান্তিনো নিজেও সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবলের ধনী ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে আর্থিক বৈষম্য কমানোর যুক্তিকে সামনে এনেছেন। তার বক্তব্য, ফিফাকে আরও বেশি আয় করে তা ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগ করতে হবে।
ফলে এখন বিষয়টি শুধু একটি বাতিল হওয়া বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ফিফার নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, খেলোয়াড়-সমর্থকদের অংশগ্রহণ এবং বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ পরিচালনার কাঠামো নিয়ে বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
একদিকে চেফেরিনসহ প্রভাবশালী প্রশাসকদের বিরোধিতা এবং ফুটবলারদের ‘পরিবর্তন দরকার’ বার্তা; অন্যদিকে স্যামুয়েল ইতো ও আফ্রিকার ফুটবল প্রশাসনের একাংশের সমর্থন—এই দুই বিপরীত স্রোতের মাঝখানেই এখন দাঁড়িয়ে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
আসন্ন ফিফা নির্বাচন তাই শুধু একজন সভাপতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; বিশ্ব ফুটবল কোন পথে চলবে, সেই প্রশ্নেরও বড় উত্তর দিতে পারে।