পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা এবং কারাগারে তাঁর চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে জোরালো হচ্ছে। এবার পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ইমরান খানকে জনজীবন ও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটন।
সোমবার স্কাই স্পোর্টস ক্রিকেটে কথা বলার সময় আথারটন বলেন, তিনি ও ইংল্যান্ডের আরেক সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইনসহ ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক ইমরানের চিকিৎসার দাবিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে দ্বিতীয়বারের মতো চিঠি দিয়েছেন। তাঁদের আবেদনকে রাজনৈতিক কোনো অবস্থান নয়, বরং একজন সাবেক সহকর্মী ও ক্রিকেটারের প্রতি মানবিক আবেদন হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
আথারটনের ভাষ্য, পাকিস্তানি রাষ্ট্র ইমরান খানকে প্রায় ‘অস্তিত্বহীন’ করে ফেলার চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেটি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ইমরানকে ঘিরে রাষ্ট্রীয়ভাবে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু একজন রাজনীতিকের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ক্রিকেটের ইতিহাস ও একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের উত্তরাধিকারও জড়িয়ে আছে।
ইমরানের চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিতে ২৩ আগস্ট পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে চিঠি পাঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২১ সাবেক অধিনায়ক। তাঁদের মধ্যে ভারতের সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব ও দিলীপ ভেংসরকার, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেগ চ্যাপেল, স্টিভ ওয়াহ, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও বেলিন্ডা ক্লার্ক, ইংল্যান্ডের মাইকেল আথারটন, নাসের হুসেইন, অ্যালিস্টার কুক, মাইকেল ব্রিয়ারলি, অ্যান্ড্রু স্ট্রস ও ডেভিড গাওয়ারের মতো সাবেক অধিনায়কেরা রয়েছেন।
এটি ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে সাবেক ক্রিকেট অধিনায়কদের দ্বিতীয় সম্মিলিত আবেদন। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৪ জন সাবেক অধিনায়ক পাকিস্তান সরকারের কাছে চিঠি দিয়ে ইমরানের প্রয়োজনীয় ও নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন তাঁর চোখের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তাঁর পরিবার দাবি করেছিল, এক চোখে তাঁর দৃষ্টিশক্তি প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং বলছে, কারাগারে ইমরান প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক চিঠির পেছনে নতুন করে যে ঘটনা কাজ করেছে, তা হলো ইমরানকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া নিয়ে বিতর্ক। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ তাঁকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) নেয়। সেখানে কয়েক ঘণ্টার চিকিৎসা পরীক্ষার পর তাঁকে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এই ঘটনায় আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালত যে ধরনের চিকিৎসা ও মেডিকেল বোর্ডের নির্দেশ দিয়েছিল, তা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে হাসপাতাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে।
সাবেক ক্রিকেট অধিনায়কদের চিঠিতেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁরা ইমরানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে আদালতের নির্দেশিত মেডিকেল বোর্ডকে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইমরানের পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দ্রুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইমরানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তাঁর সাবেক সতীর্থ ও পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রমিজ রাজাও সম্প্রতি কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, ইমরান কারাগারে অনেকটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে থাকার কারণে সময়টা তাঁর জন্য কঠিন বলেও মন্তব্য করেন রমিজ। সম্প্রতি ইমরানের চোখে সমস্যা হয়েছিল, তবে সেটি আপাতত সামলে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ একাধিক মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। ইমরান ও তাঁর দল এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, তিনি আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই কারাগারে আছেন।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে ইমরান ছিলেন পাকিস্তানের সবচেয়ে পরিচিত ক্রিকেটারদের একজন। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর তিনি পাকিস্তানের হয়ে ৮৮ টেস্ট ও ১৭৫ ওয়ানডে খেলেন। অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর বোলিং ও ব্যাটিং দক্ষতা তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত করে।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন আসে অধিনায়ক হিসেবে। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে ইমরানের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতে। টুর্নামেন্টের শুরুতে পিছিয়ে থাকা দলকে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন করার সেই অভিযান পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
ক্রিকেট ছাড়ার পর ইমরান রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে তাঁর সরকারের পতন ঘটে। এরপর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
ইমরানকে ঘিরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রভাব এবার ক্রিকেট অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তাঁর সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সতীর্থদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সাবেক অধিনায়কদের একযোগে চিকিৎসার দাবি জানানো ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাঁদের বক্তব্যে রাজনৈতিক পক্ষ নেওয়ার চেয়ে একজন সাবেক ক্রিকেটারের মানবিক ও চিকিৎসাগত অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে।
আথারটনের মন্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর অভিযোগ, ইমরানের রাজনৈতিক উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর ঐতিহাসিক ও জনসম্পৃক্ত পরিচয়ও মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইমরানের ক্রিকেটীয় জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীর কারণে সেই প্রচেষ্টা সহজ হবে না—এমনটাই মনে করছেন আথারটন।