রাজধানীর প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এসব যান কোথায় ও কতটুকু চলতে পারবে, কোন মানের যান চলাচলের অনুমতি পাবে, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় নীতিমালায় নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার কারিগরি নিরাপত্তা ও মান নিয়েও বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজধানীর বড় ও প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কিছুটা সুবিধা হলেও যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। চালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং যানগুলোর কারিগরি মান ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সরকার খুব দ্রুত এ বিষয়ে নীতিমালা করতে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোন এলাকায় এসব যান চলাচল করতে পারবে এবং কতটুকু চলতে পারবে, যানবাহনের মান কেমন হবে—এসব বিষয় নীতিমালায় স্পষ্ট করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সরকারের এই উদ্যোগ এমন সময়ে এল, যখন রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সহজলভ্যতা, স্বল্প ভাড়া এবং গণপরিবহনের ঘাটতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে এসব যান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক রিকশা কার্যকর নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, চালকের প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি ফিটনেস পরীক্ষার বাইরে থাকায় সড়কে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। এর মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। তবে সরকারি নিবন্ধনের বাইরে থাকা যানগুলোর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। বিভিন্ন গবেষণা ও বেসরকারি সংস্থার হিসাবেও সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। ফলে এই খাতের আকার সম্পর্কে সরকারের কাছে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার নেই।
রাজধানীর অলিগলি, আবাসিক এলাকা ও স্থানীয় বাজারসংলগ্ন সড়কে এসব যান সবচেয়ে বেশি চলাচল করলেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় সড়কেও তাদের উপস্থিতি বেড়েছে। ধীরগতির রিকশা যখন বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সঙ্গে একই সড়কে চলে, তখন সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। যাত্রী ওঠানো-নামানোর সময় হঠাৎ থেমে যাওয়া, এক লেন থেকে অন্য লেনে চলে যাওয়া কিংবা উল্টো পথে চলার প্রবণতাও যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত হয়েছেন। যদিও ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঘিরে দুর্ঘটনার পৃথক পরিসংখ্যান বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে ভিন্ন, তবে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যে সড়ক নিরাপত্তার জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি এসব যানবাহনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় ওয়ার্কশপে ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি ও পরিবর্তন করা হয়। মোটর, ব্যাটারি, কন্ট্রোলার, ব্রেক, স্টিয়ারিং ও বৈদ্যুতিক সংযোগের ক্ষেত্রে সব যান একই ধরনের মান অনুসরণ করে না। অনেক যানবাহনে যাত্রী সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার সময় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া গাড়ি চালানোর কারণে ব্যস্ত মোড়, ট্রাফিক সংকেত, ওভারটেকিং এবং পথচারী পারাপারের সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে নতুন নীতিমালায় চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সকে বাধ্যতামূলক করা হলে সড়ক নিরাপত্তায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাও একটি বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব যান চার্জ দেওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট গড়ে উঠেছে। এর অনেকগুলোই অনুমোদিত নয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজার ১৩৬টির বেশি। এসব অননুমোদিত স্থাপনায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি অগ্নিঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
ব্যাটারি চার্জে বিদ্যুতের চাহিদাও কম নয়। একটি যান সম্পূর্ণ চার্জ করতে কয়েক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। বিপুলসংখ্যক যান একই সময়ে চার্জে বসলে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর গ্যারেজগুলোতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
তবে এসব যানকে কেবল নিষিদ্ধ বা প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। স্বল্প আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ কর্মস্থল, বাসাবাড়ি ও স্থানীয় বাজারে যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এই খাত লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।
তাই নীতিমালায় নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ধাপে সব ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেস তৈরি করা জরুরি। এরপর প্রতিটি যানবাহনের ব্রেক, স্টিয়ারিং, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সংযোগ, মোটর ও কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করে ফিটনেস সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চালকদের ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজধানীর প্রধান সড়ক, অলিগলি ও স্থানীয় সড়কের জন্য আলাদা চলাচলব্যবস্থা নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোথায় এসব যান চলবে এবং কোথায় চলবে না, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকলে চালকদের ইচ্ছামতো প্রধান সড়কে ওঠার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।
চার্জিং ব্যবস্থাপনাকেও নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি। অবৈধ সংযোগ ও অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট বন্ধ করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক নিরাপদ ও অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং ব্যবস্থার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
এর আগে সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে নিবন্ধনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে এসব যান চার্জ দেওয়ার শর্ত যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সরকারের নতুন নীতিমালা তাই শুধু চলাচল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। নিবন্ধন, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, নির্দিষ্ট রুট, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন এবং নিয়মিত নজরদারি—সবকিছুকে একই কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন দেশের নগর ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একদিকে এর অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে গণপরিবহনের ঘাটতি পূরণে এটি সাধারণ মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন। ফলে পুরো খাতকে নিষিদ্ধ করার বদলে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজধানীর সড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই বাহনে যাতায়াত করেন। তাঁদের জন্য সাশ্রয়ী পরিবহনের সুযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে প্রস্তাবিত নীতিমালার দ্রুত বাস্তবায়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ—দুইটিই নিশ্চিত করতে হবে।