কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় ফাতেমা আক্তারের দিন। চারদিকে যখন সৈকত প্রায় নীরব, তখন উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই শুরু করেন দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। কখনো ঢেউ তাঁকে সামনে এগিয়ে দেয়, কখনো ছিটকে ফেলে দেয় পানিতে। কিন্তু প্রতিবারই উঠে দাঁড়িয়ে আবার বোর্ডে ফিরে যান ফাতেমা। লক্ষ্য একটাই—জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠেয় ২০তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পতাকা হাতে সার্ফিংয়ে ইতিহাস তৈরি করা। ফাতেমা আক্তার বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে এশিয়ান গেমসের মঞ্চে বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের অভিষেক হবে তাঁর হাত ধরে। দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনে এটি হতে পারে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা।
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ২০তম এশিয়ান গেমস। ২৬ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর সার্ফিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে আইচি প্রিফেকচারের তাহারা সিটির প্যাসিফিক লং বিচ ও আকাবানে লং বিচে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই ক্রীড়া আসরে সার্ফিং ডিসিপ্লিনে এবারই প্রথম অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। পুরুষ বিভাগে মোহাম্মদ মান্নানের পাশাপাশি নারী বিভাগে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ফাতেমা আক্তার। ফাতেমার সতীর্থ মোহাম্মদ মান্নান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল ভিন্নধর্মী কিছু করার। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই নিজেদের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে আজ এশিয়ান গেমসের মঞ্চে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে।’
ফাতেমার পৈতৃক বাড়ি কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে। পরিবারের জীবিকার প্রয়োজনে তাঁর বাবা ফকির আহমদ মহেশখালী ছেড়ে কক্সবাজার শহরে চলে আসেন। বর্তমানে কলাতলী এলাকায় বসবাস করছে তাঁদের পরিবার। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ফাতেমা বেড়ে উঠেছেন সীমিত সামর্থ্যের একটি পরিবারে।

সার্ফিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং খেলায় একজন মেয়ের পথচলা সহজ ছিল না। বিশেষ করে রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশে পরিবার ও আশপাশের মানুষের নানা প্রশ্ন ও বাধা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে। সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে শুরুর দিনের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে ফাতেমা বলেন, ‘ছোটবেলায় সার্ফারদের পেছন পেছন আমিও সমুদ্রসৈকতে চলে আসতাম। মা আসতে দিতে চাইতেন না, তাই অনেক সময় লুকিয়েই চলে আসতাম সার্ফিং শেখার জন্য। তখন হয়তো জানতাম না সার্ফিং আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে, শুধু ঢেউয়ের প্রতি একটা অদ্ভুত টান অনুভব করতাম।’ তিনি বলেন, “মেয়ে হয়ে সার্ফিং করি বলে অনেকেই আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। নানা বৈষম্য আর কটু কথার শিকার হতে হয়েছে। অনেক সময় কষ্টও পেয়েছি। কিন্তু থেমে যাইনি। কারণ, আমার একটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নকে বুকে নিয়েই সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে গেছি। শুরুতে সার্ফিং কী, সেটাই বুঝতাম না। এখন বড় ঢেউ না পেলে আমার দিনই কাটে না। সার্ফিং যেন আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে।’
তার এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রচলিত গণ্ডি ভেঙে নতুন এক সম্ভাবনার গল্পও। যে খেলাকে কয়েক বছর আগেও দেশের অনেক মানুষ চিনতেন না, সেই সার্ফিংয়েই এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন কক্সবাজারের এক তরুণী। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিনের কঠোর প্রশিক্ষণ সামলানোও ফাতেমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখতে চান না তিনি। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুশীলনস্থল।
বাংলাদেশ সার্ফ গার্লস অ্যান্ড বয়েজ ক্লাবের প্রধান কোচ রাশেদ আলমের তত্ত্বাবধানে চলছে তাদের প্রশিক্ষণ। অনুশীলনে তাঁর সঙ্গে থাকছেন সহ-সার্ফার মোহাম্মদ মান্নান। মোহাম্মদ মান্নান বলেন, 'আসলে অনেক বাধা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু এসব বাধা এড়িয়ে আমি সার্ফিংকে আঁকড়ে ধরে আছি, সার্ফিং করে যাচ্ছি। যার কারণে আজ এশিয়ান গেমসে নির্বাচিত হতে পেরেছি।' আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এত বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে হতাশা রয়েছে তাঁর। মান্নান বলেন, 'সাপোর্টের বিষয়টি আসলে না বললেই নয়। আমাদের এখানে কোনো ধরনের পর্যাপ্ত সাপোর্ট নেই। নিজেদের খরচেই নিজেদের চালাতে হচ্ছে। আমরা এত বড় একটি এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে যাচ্ছি, অথচ আমাদের জন্য কোনো ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেই।' জাপানের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, দেশে থেকেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে প্রস্তুতি আরও ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি, 'আমি প্রত্যাশা করেছিলাম, আমাদের যদি দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে আমরা আরও ভালো কিছু করার আশা করতে পারতাম,' বলেন মান্নান। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁর স্বপ্নে কোনো ঘাটতি নেই। আমরা এখনো আশাবাদী। আমরা অনেক চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ, বাংলাদেশকে ভালো কিছু উপহার দিতে পারব,' বলেন তিনি।
উত্তাল ঢেউয়ের আচরণ বোঝা, বোর্ডের ওপর ভারসাম্য রাখা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে প্রতিদিন কাজ করছেন ফাতেমা। কোচ রাশেদ আলম তাঁর শিষ্য সম্পর্কে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘ফাতেমার মধ্যে শেখার প্রচণ্ড আগ্রহ এবং মানসিক শক্তি আছে। প্রতিদিনের কঠোর অনুশীলনে সে নিজেকে বেশ গুছিয়ে এনেছে। এশিয়ান গেমসের মতো বড় প্রতিযোগিতায় সে বাংলাদেশকে দারুণভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।’

সার্ফিং শুধু শারীরিক শক্তির খেলা নয়। সমুদ্রের ঢেউয়ের গতি ও উচ্চতা বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভারসাম্য ধরে রাখা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা একজন সার্ফারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসব দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নত প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতামূলক অভিজ্ঞতা।
ফাতেমার সামনে তাই চ্যালেঞ্জ কম নয়। এশিয়ান গেমসে তাঁকে অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়তে হবে। তবে তাঁর কাছে এই আসর শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; দেশের হয়ে নতুন একটি ইতিহাসের অংশ হওয়ার সুযোগ। বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি অ্যাথলেটিকস, শুটিংসহ বিভিন্ন খেলায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সেই ধারায় সার্ফিংয়ের মতো অপেক্ষাকৃত নতুন খেলায় ফাতেমার উঠে আসা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
কক্সবাজারের জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে এসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা সত্যিই প্রশংসনীয়। ফাতেমার এই সাফল্য স্থানীয় অন্যান্য তরুণী ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের ক্রীড়াঙ্গনে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।’
কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সার্ফিংয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত ও ঢেউয়ের বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে এখানেই তৈরি হচ্ছে দেশের নতুন প্রজন্মের সার্ফার। তাঁদের মধ্য থেকে ফাতেমার এশিয়ান গেমসে জায়গা করে নেওয়া স্থানীয় সার্ফিং অঙ্গনের জন্যও বড় অর্জন।

তবে একজন তরুণ সার্ফারের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার পথে ব্যক্তিগত প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মানসম্মত সার্ফিং বোর্ড ও অন্যান্য সরঞ্জাম, ফিটনেস প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং অভিজ্ঞ কোচিং—সবকিছুর সমন্বয় দরকার। ফাতেমার সাফল্য তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের সার্ফিংকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় দেশে খেলাটির প্রতি আগ্রহও বাড়তে পারে। বিশেষ করে একজন নারী সার্ফারের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতি আরও অনেক মেয়েকে এই খেলায় আসতে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফাতেমার স্বপ্ন এখন কক্সবাজারের ঢেউ পেরিয়ে জাপানের আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছানো। যে সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন ভোরে তাঁর অনুশীলন শুরু হয়, সেই ঢেউয়ের কাছ থেকেই তিনি শিখছেন পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে। সামনে এশিয়ান গেমস। সঙ্গে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। ফাতেমা জানেন, সেখানে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত শুধু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের হিসাব নয়; বাংলাদেশের নারী সার্ফিংয়ের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকবে। তাই কক্সবাজারের ঢেউয়ে প্রতিদিনের অনুশীলন এখন তাঁর কাছে ইতিহাসের প্রস্তুতি।