দাবার বোর্ডে বসে চাল দেওয়াই যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরাধ! উজবেকিস্তানের সামরকন্দে ৪৬তম দাবা অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে দেশে ফেরার পর আফগানিস্তানের তিন দাবাড়ুকে আটক করেছে তালেবান সরকার। সীমান্তে তাদের পাসপোর্ট জব্দ করার পর আলাদা কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে কাবুলে নিয়ে তাদের গৃহবন্দী করা হয়েছে। দেশটিতে দাবা নিষিদ্ধ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে শারীরিক শাস্তিসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আটক তিন দাবাড়ু হলেন খাইবার ফারাজি, হাবিবুল্লাহ আমিনি ও হাবিবুল্লাহ গুলদুস্ত। তাদের মধ্যে ফারাজি ও আমিনি আফগানিস্তানের ওপেন দলের সদস্য। গুলদুস্ত ছিলেন আফগান নারী দলের অধিনায়ক। সামরকন্দে অনুষ্ঠিত অলিম্পিয়াডে আফগানিস্তানের পুরুষ ও নারী—দুই দলই অংশ নেয়।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ সেপ্টেম্বর। অলিম্পিয়াড শেষে আফগানিস্তানে ফেরার সময় সীমান্তে তাদের আটক করা হয়। খাইবার ফারাজি ও হাবিবুল্লাহ গুলদুস্ত তখন স্প্যানিশ সংবাদপত্র EL PAÍS-কে জানান, তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তিনজনকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর তাদের কাবুলে পাঠানো হয়। বর্তমানে তারা গৃহবন্দী রয়েছেন।
তবে একই দলের আরেক সদস্য মির্জাদ সাইয়েদ ওয়াহাবউদ্দিন কোনো বাধা ছাড়াই আফগানিস্তানে ফিরতে পেরেছেন। তিনি হাইরাতান সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেন। আফগান প্রতিনিধি দলের বাকি আট সদস্যের অধিকাংশই দেশের বাইরে বসবাস করেন। ফলে তাদের ক্ষেত্রে দেশে ফেরার সময় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
কেন নিষিদ্ধ দাবা?
আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে দাবা খেলা স্থগিত করে। সরকারের যুক্তি ছিল দাবার সঙ্গে জুয়া ও বাজির সম্পর্ক থাকায় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এতে আপত্তি রয়েছে। এরপর দেশটির দাবা ক্লাবগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং দাবা খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন তখন আফগানিস্তানে দাবা স্থগিতের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ফিদে বলেছিল, দাবা মূলত দক্ষতা, প্রস্তুতি, ধৈর্য ও ন্যায্যতার ওপর নির্ভরশীল খেলা এবং আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে এর চর্চা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির তরুণ দাবাড়ুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই অলিম্পিয়াডে দাবা নিষিদ্ধ থাকার পরও আফগানিস্তানের পুরুষ ও নারী দল সামরকন্দ অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আফগানিস্তানের পতাকার নিচে খেলায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি তালেবান সরকারের নজরে আসে। EL PAÍS-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আফগান দাবাড়ুরা দেশ ছাড়ার পরই তাদের আটক করার বিষয়ে সীমান্তগুলোতে সরকারি নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল।
আফগানিস্তানের ওপেন দল অলিম্পিয়াডে ২০৬ দলের মধ্যে ১২৮তম হয় এবং ১০ ম্যাচ পয়েন্ট সংগ্রহ করে। নারী দল ১৮৯ দলের মধ্যে ১৬৯তম অবস্থানে থেকে প্রতিযোগিতা শেষ করে।
নারী দলের অংশগ্রহণও আলোচনায়
আফগান নারী দলও এবারের অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। দলের চার খেলোয়াড়ই আফগানিস্তানের বাইরে বসবাস করেন। EL PAÍS-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নারী খেলোয়াড়দের বিদেশে থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং পুরুষ-নারী খেলোয়াড়দের একই ভেন্যুতে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বিষয়টিও তালেবান কর্তৃপক্ষের অসন্তোষের কারণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। এটি অবশ্য প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য তালেবান সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নয়।
শাস্তি কী হবে, জানা নেই
আটক তিন দাবাড়ুর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আফগানিস্তানের ফিদে প্রতিনিধি আদজমাল মাঙ্গাল EL PAÍS-কে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে বলেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন আটক খেলোয়াড়েরা বাড়িতে আছেন এবং কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পরিষ্কার হতে পারে। অন্যদিকে আফগান দলের অধিনায়ক জাহির আসেফি, যিনি নেদারল্যান্ডসে বসবাস করেন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চেসবেস ও জানিয়েছে, তিন খেলোয়াড়কে সীমান্তে আটকের পর কাবুলে গৃহবন্দী করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কঠোর শাস্তির আশঙ্কা রয়েছে। তবে কী শাস্তি দেওয়া হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতা
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক দাবা অঙ্গনেও আলোড়ন তুলেছে। ফিদে আটক খেলোয়াড়দের বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টেও বিষয়টি আলোচনায় তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্পেনের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ইগনাসিও সানচেজ আমোর এ বিষয়ে আলোচনা চেয়েছেন বলে EL PAÍS জানিয়েছে। ফলে সামরকন্দের দাবা অলিম্পিয়াড শেষ হলেও আফগান দাবাড়ুদের জন্য লড়াই যেন শেষ হয়নি। দাবার বোর্ডে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই শেষে দেশে ফিরে এখন তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে আরেক অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য—দাবা খেলার ‘অপরাধে’ তাদের ভাগ্যে কী শাস্তি জুটবে?