এশিয়ান গেমসে পুরুষ হকিতে চীনের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের বাছাইপর্বে খেলার সুযোগ হারিয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার গিফুতে অনুষ্ঠিত স্থান নির্ধারণী ম্যাচে স্বাগতিক চীনের কাছে ১-৭ গোলে হেরেছে জিমির নেতৃত্বাধীন দল। এই পরাজয়ের ফলে পঞ্চম-ষষ্ঠ স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলার সুযোগ যেমন শেষ হয়েছে, তেমনি অলিম্পিকের বাছাইয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
এশিয়ান গেমসে চীনকে হারাতে পারলে পঞ্চম-ষষ্ঠ স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলার সুযোগ পেত বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ২০২৮ অলিম্পিকের হকি বাছাইপর্বে এশিয়া থেকে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতো। কিন্তু বড় ব্যবধানে হেরে এখন সপ্তম-অষ্টম স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হবে বাংলাদেশকে। আগামী ৩ অক্টোবর থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ম্যাচে মুখোমুখি হবে তারা।
এশিয়ান হকির টুর্নামেন্ট ডাইরেক্টর গোলাম গাউস জানিয়েছেন, এশিয়ান গেমসের শীর্ষ ছয় দল পরবর্তী এশিয়ান গেমসে সরাসরি খেলার সুযোগ পাবে। কোনো দল অংশ না নিলে সপ্তম দলও সেই সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে অলিম্পিক বাছাইপর্বে এশিয়া থেকে শীর্ষ ছয় দলের অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে জানান তিনি।
ফলে চীনের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য কেবল এশিয়ান গেমসে অবস্থান নির্ধারণের লড়াই ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ভবিষ্যৎ অলিম্পিকের পথও। সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ভেঙে পড়ে।
চীনের বিপক্ষে ম্যাচে শুরু থেকেই চাপের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামাল দিতে গিয়ে রক্ষণভাগকে একাধিকবার বিপাকে পড়তে হয়। বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন রাকিবুল হাসান। তবে চীনের সাত গোলের জবাবে সেই একটি গোল কোনোভাবেই ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
বড় হারের পর দলের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের জার্মান কোচ পিটার গেরহার্ড। তাঁর মতে, সাত গোলে হারার মতো দল বাংলাদেশ নয়। খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ও শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি দলের সঙ্গে কোনো ফিজিওথেরাপিস্ট না থাকার বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি।
পিটার বলেন, খেলোয়াড়দের অনেকেই ক্লান্ত এবং কারও কারও শরীরে ব্যথা রয়েছে। দলের সঙ্গে অনেক কর্মকর্তা থাকলেও একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ছিলেন না। এমনকি একজন খেলোয়াড়কে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজনও হয়েছে।
ফিজিও না থাকার বিষয়টি নিয়ে দলের ম্যানেজার ও ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক আরিফুল হক প্রিন্স বলেন, এশিয়ান গেমসে সাধারণত ফিজিও সুবিধা পাওয়া যায়। এবার বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ফিজিও থাকলেও হকি ভেন্যু নাগোয়া থেকে দূরে হওয়ায় তাঁকে নিয়মিত পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দেশ থেকে ফিজিও নেওয়া সম্ভব ছিল কি না—এমন প্রশ্নে প্রিন্স বলেন, খেলোয়াড় ও কোচের কার্ড নিয়েই জটিলতা ছিল। সে কারণে তখন ফিজিও নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যায়নি।
তবে কোচ পিটার শুধু ফিজিও সংকটকেই দায়ী করেননি। চীন থেকে ঢাকায় এবং ঢাকা থেকে জাপানে ভ্রমণের ক্লান্তির কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, নারী হকি দল চীন থেকে সরাসরি জাপানে আসতে পারায় যে সুবিধা পেয়েছে, পুরুষ দলও একই সুবিধা পেলে ভালো হতো। তবে ভ্রমণসূচি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ফেডারেশনের—এ কথাও স্পষ্ট করেন তিনি।
বাংলাদেশ হকির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলে একাধিক গ্রুপ রয়েছে—এমন গুঞ্জন থাকলেও কোচ পিটার তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দলে কোনো গ্রুপিং নেই এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে একতা রয়েছে।
ফরোয়ার্ড কৌশিকের না খেলা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোচের সঙ্গে তাঁর দূরত্বের কারণে তিনি খেলতে পারছেন না—এমন আলোচনা থাকলেও পিটারের বক্তব্য, চীনে একটি ঘটনায় কৌশিক নিজের ওপরই রাগ করেছিলেন এবং এর সঙ্গে তাঁর করার কিছু নেই।
কৌশিকের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, চীনে কয়েকটি ঘটনায় তিনি অপমানিত বোধ করে নিজের ওপর রাগ করেছিলেন এবং একপর্যায়ে গ্লাস ভেঙেছিলেন। পরে বিষয়টিকে সতীর্থদের কেউ কেউ কোচের প্রতি তাঁর অভিমান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
চীনের বিপক্ষে সাত গোলের হার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের তুলনায়ও বড় ধাক্কা। দলের তরুণ খেলোয়াড় আমিরুল ইসলাম মনে করেন, এর পেছনে অভিজ্ঞ ও মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, দলে ভালো খেলোয়াড়ের সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও কম।
বাংলাদেশের কয়েকজন সিনিয়র খেলোয়াড় শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেললেও আমিরুলের মতে, ম্যাচের সংখ্যা দিয়ে সব সময় বাস্তব অভিজ্ঞতা বোঝা যায় না। তিনি বলেন, ভারতের একজন খেলোয়াড় দুই বছরের মধ্যেই ১০০ ম্যাচ খেলার সুযোগ পান; বিপরীতে বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় ১২-১৩ বছরেও ১০০ ম্যাচ খেলতে পারেন না। এমনকি কেউ কেউ বছরে একটি ম্যাচ খেলার সুযোগও পান না। ফলে বয়স ও জাতীয় দলে থাকার সময় বেশি হলেও ম্যাচের অভিজ্ঞতায় ঘাটতি থেকে যায়।
চীনের কাছে এই পরাজয়ে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অবস্থান আরও নিচে নেমেছে এবং একই সঙ্গে অলিম্পিক বাছাইয়ের পথও বন্ধ হয়েছে। এখন থাইল্যান্ডের বিপক্ষে সপ্তম-অষ্টম স্থান নির্ধারণী ম্যাচই বাংলাদেশের সামনে শেষ সুযোগ। তবে ফলাফলের বাইরে চীন ম্যাচের পর উঠে আসা ফিটনেস, ফিজিও, ভ্রমণ, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতার প্রশ্নগুলোই বাংলাদেশের হকির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।