সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিনটি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে স্মরণীয় করে রাখলেন হাসান মাহমুদ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিংয়ে তুলে নিলেন ৬ উইকেট। টেস্ট ক্যারিয়ারে পঞ্চমবারের মতো ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট পাওয়ার কীর্তি গড়লেন এই ডানহাতি পেসার। শুধু তাই নয়, দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো পাঁচ উইকেটের স্বাদ পেলেন তিনি। কিন্তু হাসানের এমন অসাধারণ পারফরম্যান্সের দিনেও ব্যাট হাতে বাংলাদেশের চিত্র ছিল হতাশাজনক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে ৪০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৮৮ রান তুলেছে স্বাগতিকরা। এখনো ২৬৮ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ। দিনের শেষভাগে তাওহিদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিমের অবিচ্ছিন্ন জুটি কিছুটা স্বস্তি দিলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এখনো ক্যারিবীয়দের হাতেই।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম দিনের খেলা শেষে ৪ উইকেটে ২৩৫ রান নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল সফরকারীরা। দ্বিতীয় দিন সকালে তাদের লক্ষ্য ছিল বড় সংগ্রহের দিকে এগিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল দ্রুত অবশিষ্ট উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষকে তিন শ রানের মধ্যে আটকে রাখা। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে শেষ পর্যন্ত ৩৫৬ রানে থামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। আগের দিনের সংগ্রহের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনে আরও ১২১ রান যোগ করে ১০৬.৪ ওভারে অলআউট হয় তারা।
ক্যারিবীয়দের ইনিংসের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন আমির জ্যাঙ্গো। ২১২ বলে ১৩ চার ও ২ ছক্কায় ১৩৩ রান করেন তিনি। বাংলাদেশের বোলারদের দীর্ঘ সময় ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে সাজঘরে ফেরেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। আগের দিন থেকেই দায়িত্বশীল ব্যাটিং করছিলেন জ্যাঙ্গো। দ্বিতীয় দিনেও তাঁর ব্যাটে ভর করে বড় সংগ্রহের পথে এগোচ্ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
তাঁকে দারুণ সঙ্গ দেন কেভিন উইকহ্যাম। ১৪৫ বলে ৬১ রান করেন এই ব্যাটার। জ্যাঙ্গোর সঙ্গে তাঁর চতুর্থ উইকেটের জুটি থেকে আসে ১৩১ রান। ২৭ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এই জুটিই ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। বাংলাদেশের বোলারদের প্রাথমিক সাফল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় তাঁদের প্রতিরোধে। পরে জাস্টিন গ্রিভসের ১১২ বলে ৫১ রানের ইনিংস সফরকারীদের সংগ্রহকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তবে দ্বিতীয় দিনের সকালে নতুন বল হাতে নিয়ে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন হাসান মাহমুদ। প্রথম সেশনে জ্যাঙ্গোকে বোল্ড করে ভাঙেন তাঁর দীর্ঘ প্রতিরোধ। এরপর পরের বলেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রোস্টন চেজকে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরান তিনি। টানা দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি করেন হাসান। হ্যাটট্রিকের বলে জশুয়া বিশপকে এলবিডব্লিউ ঘোষণা করেছিলেন আম্পায়ার। তবে রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান বিশপ। রিপ্লেতে দেখা যায়, বল তাঁর ব্যাটে লেগে প্যাডে আঘাত করেছে।
হ্যাটট্রিক না হলেও হাসানের আক্রমণ থামেনি। পরে লিটন দাসের সঙ্গে দারুণ সমন্বয়ে বিশপকে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলেন তিনি। এই উইকেটের মধ্য দিয়ে টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে নিজের বলে স্টাম্পিংয়ের মাধ্যমে উইকেট পাওয়ার কীর্তিও গড়েন হাসান। এরপর মধ্যাহ্নবিরতির পর ইনিংসের প্রথম ওভারেই শামার জোসেফকে বোল্ড করে নিজের ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেন তিনি। ২৪ ওভারে ৯০ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে শেষ করেন ক্যারিয়ারসেরা বোলিং।
হাসানের এই অর্জনের গুরুত্ব শুধু ছয় উইকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। এবার সিলেটে দেশের মাটিতে সেই তালিকায় যোগ হলো বাংলাদেশের নাম। পাঁচটি ভিন্ন দেশে প্রথম পাঁচটি পাঁচ উইকেটের কীর্তি গড়া বোলারদের তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার নাথান লায়নের পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে টেস্টে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে সর্বাধিক পাঁচ উইকেটের ইনিংসের রেকর্ডে শাহাদাত হোসেনকে ছাড়িয়ে গেছেন হাসান।
বাংলাদেশের হয়ে হাসানের পাশাপাশি তাসকিন আহমেদ ও মেহেদী হাসান মিরাজ ২টি করে উইকেট নিয়েছেন। মিরাজের বোলিংয়ে এসেছে ৩১.৪ ওভারে ৮২ রান, যার মধ্যে ছিল ৫টি মেডেন। তাসকিন ২১ ওভারে ৯০ রান দিয়েছেন। অন্যদিকে তাইজুল ইসলাম ১৯ ওভার বল করেও কোনো উইকেট পাননি। শেষদিকে জোমেল ওয়ারিকান ও জেইডেন সিলসের প্রতিরোধে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ আরও বাড়ে। দশম উইকেটে ৩৩ রান যোগ করেন তাঁরা। ওয়ারিকান ২৭ রানে অপরাজিত থাকেন।
৩৫৬ রানের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল উদ্বেগজনক। নিয়মিত ওপেনার শাদমান ইসলামের গোড়ালির চোটের কারণে তাঁকে ছাড়াই ইনিংস শুরু করতে হয় স্বাগতিকদের। তাঁর পরিবর্তে ওপেনিংয়ে নামেন নাইম হাসান। কিন্তু এই পরিবর্তিত উদ্বোধনী জুটি বেশিক্ষণ টেকেনি। জেইডেন সিলসের বলে ৬ বলে ৫ রান করে আউট হন নাইম। অন্য প্রান্তে জাস্টিন গ্রিভসের বলে ৩৩ বলে ১৬ রান করে সাজঘরে ফেরেন তানজিদ হাসান। মাত্র ২২ রানে দুই ওপেনারকে হারিয়ে শুরুতেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
এরপর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও তাওহিদ হৃদয় কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দলের রান ৫১ হওয়ার পর ব্যক্তিগত ১৮ রানে শামার জোসেফের বলে বোল্ড হন শান্ত। ৬৫ বলের ইনিংসে তিনি কোনোভাবেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। তাঁর বিদায়ে আরও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ার দায়িত্ব তখন পড়ে যায় পরের ব্যাটারদের ওপর।
এমন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেছেন তাওহিদ হৃদয় ও অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। চতুর্থ উইকেটে তাঁদের ৩৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি দিন শেষে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্বস্তি। ৮০ বল খেলে ২৯ রানে অপরাজিত আছেন হৃদয়। অন্যদিকে ৫৬ বলে ১৯ রান নিয়ে তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছেন মুশফিক। দুজনই পরিস্থিতি বুঝে সতর্ক ব্যাটিং করেছেন। উইকেটে টিকে থাকার পাশাপাশি বাজে বলের অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। দিনের শেষ দিকে কয়েকটি বাউন্ডারি আদায় করে নিয়ে রানসংখ্যা কিছুটা বাড়ান। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার মতো আগ্রাসী ব্যাটিং দেখা যায়নি।
মুশফিকের ইনিংসেও ছিল একবার বেঁচে যাওয়ার ঘটনা। ব্যক্তিগত ১০ রানের সময় জোমেল ওয়ারিকানের বলে এলবিডব্লিউর আবেদন ওঠে। আম্পায়ার আউট না দেওয়ার পর রিভিউ নেওয়া হলেও বলের প্রভাবের ক্ষেত্রে আম্পায়ার্স কল থাকায় বেঁচে যান অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। এরপর হৃদয়ের সঙ্গে জুটি গড়ে দিনের বাকি সময়টা কাটিয়ে দেন তিনি। বাংলাদেশের জন্য এই জুটির গুরুত্ব এখন কেবল রানসংখ্যায় নয়, বরং পরের দিনের লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রেও।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা দ্বিতীয় ইনিংসে শুরু থেকেই বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওপর চাপ ধরে রেখেছেন। জেইডেন সিলস, জাস্টিন গ্রিভস ও শামার জোসেফ একটি করে উইকেট নিয়েছেন। বিশেষ করে বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকানের বোলিং ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। ১২ ওভার বল করে ৫টি মেডেনসহ মাত্র ১৯ রান দিয়েছেন তিনি। উইকেট না পেলেও তাঁর আঁটসাঁট বোলিং বাংলাদেশের ব্যাটারদের রান তোলার গতি কমিয়ে দিয়েছে। দিন শেষে বাংলাদেশের রানরেট দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.২০।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার নাম সাদমান ইসলাম। ফিল্ডিংয়ের সময় বল থামাতে গিয়ে বাঁ গোড়ালিতে চোট পান এই ওপেনার। পরে তাঁকে স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে নেওয়া হয় এবং এমআরআই পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁর চোটের প্রকৃতি ও পরবর্তী সময়ে ব্যাটিং করার সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে পরের দিন বাংলাদেশের ব্যাটিং পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে। প্রথম ইনিংসে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা দলের জন্য নিয়মিত ওপেনারের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ০-১ ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে সিলেট টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানো স্বাগতিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ম্যাচে হারলে সিরিজ জয়ের সুযোগও হাতছাড়া হবে। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে সিরিজ জয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশকে আরও চাপে ফেলার সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় দিনের শেষে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রথম ইনিংসে যতটা সম্ভব ঘাটতি কমিয়ে আনা। এখনো সাত উইকেট হাতে থাকলেও সাদমানের চোট এবং টপ অর্ডারের ব্যর্থতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। হৃদয় ও মুশফিকের জুটিকে শুধু টিকিয়ে রাখলেই হবে না, সেটিকে বড় জুটিতে রূপ দিতে হবে। পরের দিন লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ ও পরের দিকের ব্যাটারদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। হাসান মাহমুদের অসাধারণ বোলিংয়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগাতে না পারলে তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনও দলের জন্য বড় কোনো সুবিধা বয়ে আনবে না। সিলেটে তাই তৃতীয় দিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশের মূল ভরসা এখন মুশফিকের অভিজ্ঞতা ও হৃদয়ের প্রতিরোধ।