গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন, ২০২০ সালের সরকারি গেজেটে নেই সূর্যাস্তের নিষেধাজ্ঞা
ইউএনওর বক্তব্যের সঙ্গে বিধিমালার অসংগতি, পুলিশ পাঠিয়েও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অনুপস্থিতির অভিযোগ
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়েও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন করা হয়েছে ৭৮ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারকে। মরদেহ গ্রামে পৌঁছেছিল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে। রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের জন্য স্বজন ও সহযোদ্ধারা অপেক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত সেই আয়োজন হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ব্যাখ্যা, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া হয় না। কিন্তু ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর জারি করা সরকারের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুরত রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন আদেশ, ২০২০’-এর সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোতে সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া নিষিদ্ধ—এমন কোনো শর্ত উল্লেখ নেই। বরং সেখানে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশের সম্মান গার্ড এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ইউএনওর বক্তব্য এবং সরকারি বিধিমালার মধ্যে অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়কে ঘিরে প্রশাসনের এমন ভূমিকা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় মারা যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার। তিনি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জীবনের শেষ সময়গুলো ঢাকায় ছেলের সঙ্গে কাটাচ্ছিলেন।
মৃত্যুর পর ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি ও অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্য, স্বজন ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত গার্ড অব অনার ছাড়াই তাঁকে দাফন করা হয়। যে মানুষটি একাত্তরে অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর মৃত্যুর সময়ও তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা থেকে বঞ্চিত হতে হলো—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্বজনেরা।
সরকারি গেজেটে কী আছে
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা ২০২০ সালের ১০ নভেম্বরের এসআরও নং ৩৫৫-আইন/২০২০ অনুযায়ী, বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ১১ নভেম্বর ২০২০ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত ওই আদেশের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বা জনবহুল কাজে ইউএনও ব্যস্ত থাকলে তাঁর পরিবর্তে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব পালনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আদেশের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে দাফন বা সৎকারের আগে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতিও নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে কফিন জাতীয় পতাকায় আবৃত করা, সরকারের প্রতিনিধির পক্ষে পুষ্পস্তবক অর্পণ, পুলিশের সম্মান গার্ডের সালাম এবং বিউগলে করুণ সুর বাজানোর কথা বলা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের উপধারা (ঘ)-তে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার গার্ড অব অনার পরিচালনার দায়িত্বের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এই আদেশের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোতে সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যাবে না—এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়নি। তাহলে কোন সরকারি আদেশ বা বিধিমালার ভিত্তিতে সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না বলে জানানো হলো? উপজেলা প্রশাসনের কাছে সেই বিধান বা নির্দেশনার ব্যাখ্যা চাওয়ার দাবি উঠেছে।
যোগাযোগের পরও কেন দায়িত্ব পালন হলো না
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ভাই শাহজাহান বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আমার ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। যে মানুষটি ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করল, সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না।’
মহালক্ষ্মীপাড়া গ্রামের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া না গেলেও অন্তত প্রশাসনের লোক এসে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তাও করা হয়নি।’
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টার জানান, গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালামের জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে জানানো হয়, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না।
সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক বলেন, তিনি মরহুমের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। গার্ড অব অনার না দেওয়ায় পুরো এলাকায় তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
পুলিশ পাঠিয়েও দায়িত্ব পালন করা গেল না
ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, গার্ড অব অনারের জন্য এক পিকআপ পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পাশাপাশি পুলিশ লাইন থেকে বিউগলের সুর বাজানোর জন্য একটি দলও এসেছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ একা গার্ড অব অনার দিতে পারেনি। অবশ্য পুলিশ সদস্যরা জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন।
ওসির এই বক্তব্যের পর সরকারি আদেশের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের (গ) ও (ঘ) উপধারায় পুলিশের সম্মান গার্ড এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। পুলিশের প্রস্তুতি থাকার পরও প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় কেন রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের আয়োজন সম্পন্ন করা গেল না, সেই প্রশ্নের জবাবও প্রয়োজন।
ইউএনওর বক্তব্যে উঠছে প্রশ্ন
অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্নী ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া হয় না। তারপরও তাঁরা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে ঢাকা থেকে মরদেহ আনা নিয়ে দ্বিধা ছিল। মাগরিবের পর কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, তাই গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের দাবি, এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হয়েছিল। ফলে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না, মরদেহ পৌঁছানোর সময় প্রশাসন কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং বিকল্প কর্মকর্তা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়; এটি সরকারি আদেশে নির্ধারিত দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে কী ধরনের ব্যর্থতা ঘটেছে, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার না দেওয়ার দাবির পক্ষে কোন নির্দেশনা রয়েছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কেন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের দাবি উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ও সহযোদ্ধাদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য যিনি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁর শেষ বিদায়েও কি প্রশাসনিক সময়সূচি ও যোগাযোগের অজুহাতই বড় হয়ে উঠবে?