পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই জোটটির সম্ভাব্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকাশ্যে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। মিসরও বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। আর ইরান এই জোটে যোগ দিলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে ইরানকে ঘিরে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। দেশটির পার্লামেন্টের গণমাধ্যমবিষয়ক এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তেহরানকে জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের কাছে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পৌঁছায়নি।
জোটের সম্প্রসারণ ঘটলে এর ভৌগোলিক পরিসর পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর, ভারত মহাসাগর হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। আর প্রথম সম্প্রসারণের সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো শক্তিধর দেশকে দিয়ে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশকে দিয়ে শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি জানিয়েছেন, ঢাকা মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আগ্রহী এবং এতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে।
বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় আরেকটি বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যুক্ত হবে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও জোটটির উপস্থিতি বাড়বে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ আলী জাফরের মতে, বর্তমান সদস্যদের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য অংশীদার হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ঢাকার পক্ষে এখনই এমন একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে না। তাঁর মতে, বাংলাদেশের যোগদান ভারতকেও অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। কারণ, চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হলো—এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে একই সামরিক অবস্থানে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা দিল্লির মধ্যে তৈরি হতে পারে।
আলী জাফর প্রশ্ন তুলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার মতো যথেষ্ট কৌশলগত কারণ বাংলাদেশের আছে কি না। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকার জন্য কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সুস্পষ্ট যুক্তি নেই। তবে ইরানসহ আরও কয়েকটি দেশ জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সদস্য হওয়ার কৌশলগত মূল্য নতুন করে বিবেচনা করা হতে পারে।
ইরান যোগ দিলে বদলে যাবে সমীকরণ
ইরান এই জোটে যোগ দিলে এর কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে জোটটির সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত জটিলতাও তৈরি হবে। কারণ, মক্কা চুক্তি এমন এক সময়ে গঠিত হয়েছে, যখন ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্য—পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব—নিজ নিজ স্বার্থে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।
তেহরানের ইনস্টিটিউট ফর বিআরআই স্টাডিজের গবেষক আলি হোসেইনি, যিনি ছদ্মনামে কথা বলেছেন, মনে করেন এই জোটে যোগ দেওয়া ইরানের জন্য কৌশলগত ভুল হতে পারে। তাঁর মতে, ইরানকে ঘিরে উদ্বেগ থেকেই জোটটির নিরাপত্তা কাঠামোর একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছে। হোসেইনির ভাষ্য, এই কাঠামোয় সরাসরি যুক্ত হলে ইরানের নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। তাই সামরিকভাবে একীভূত হওয়ার পরিবর্তে জোটটির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখাই তেহরানের জন্য বেশি লাভজনক হতে পারে।
অন্যদিকে আলী জাফরের মতে, ইরান যুক্ত হলে মক্কা জোট একটি সীমিত প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে তার আগে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্য দূর করতে হবে। বিশেষ করে বর্তমান সদস্যরা ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চাইবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। ফলে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করলে জোটের শক্তি যেমন বাড়বে, তেমনি দায়িত্ব, ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও বাড়বে।
মিসরের সামনে বড় কূটনৈতিক হিসাব
মিসরও মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেছেন, কায়রো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ও তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক অফির উইন্টারের মতে, মিসর এখনো দ্বিধায় রয়েছে। কারণ, জোটটি ঠিক কোন হুমকি মোকাবিলায় গঠিত এবং সদস্য হলে কায়রোর কী ধরনের সামরিক দায়বদ্ধতা তৈরি হবে—তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
মিসরের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির ১৯৭৯ সালের শান্তি চুক্তি রয়েছে। একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও কৌশলগত যোগাযোগ রয়েছে কায়রোর। এ কারণে মিসর সরাসরি কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার চেয়ে কূটনৈতিক সমন্বয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে বলে মনে করেন উইন্টার। তাঁর মতে, কায়রো এমন কোনো জোট বেছে নিতে চাইবে না, যার কারণে অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর সঙ্গে আইনি প্রশ্নও রয়েছে। ১৯৭৯ সালের মিসর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এমন কোনো আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতায় যুক্ত হবে না, যা ওই চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে মক্কা জোটের কোনো সদস্যের সঙ্গে ভবিষ্যতে সংঘাত তৈরি হলে মিসর কী ধরনের সামরিক অবস্থান নিতে বাধ্য হবে, সেটি কায়রোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়।
ইসরায়েলের নজর তুরস্কের দিকে
মক্কা জোটের সম্ভাব্য সম্প্রসারণ ইসরায়েলও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অফির উইন্টারের মতে, ইসরায়েলের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হতে পারে তুরস্ক। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বক্তব্য ও আঞ্চলিক নীতির পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং নতুন সিরীয় সরকারের সঙ্গে আঙ্কারার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ইসরায়েলের নজরে রয়েছে। উইন্টারের মতে, তুরস্ক যখন কোনো আঞ্চলিক সামরিক বা রাজনৈতিক জোটের অংশ হয়, তখন ইসরায়েলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়। মক্কা জোটের বিস্তার তাই ইসরায়েলের আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসাবেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ
মক্কা জোটের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধাভোগীদের একটি হতে পারে পাকিস্তান। ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে হলেও সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও বজায় রেখেছে পাকিস্তান। আলী জাফরের মতে, এই অবস্থান পাকিস্তানকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি হিসেবে নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দিতে পারে।
ইসলামাবাদ এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে, যাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান তাদের সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে। মক্কা জোটের বিস্তার ঘটলে এই কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের হিসাব
মক্কা জোটকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কীভাবে দেখবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আলী জাফরের মতে, দুই দেশ ভিন্ন কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে পারে। চীন এটিকে বহুমেরুকেন্দ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর বিকাশ হিসেবে দেখতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্বে আরও বেশি ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করে আসছে। তবে একই সঙ্গে ওয়াশিংটন তার কৌশলগত প্রভাব কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১৭ আগস্ট মক্কা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এটিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন।
তবে এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা থেকে সরে যাচ্ছে—এমনটি নয়। এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব এবং বিপুল অস্ত্র সরবরাহের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র, গোয়েন্দা সহযোগিতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সামরিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে তার প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করবে। আলী জাফরের ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে যে ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে উৎসাহিত করছে, মক্কা চুক্তি মোটামুটি সেই দিকেই এগোচ্ছে।
সব মিলিয়ে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ যোগ দিলে এর পরিধি ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে; মিসর যোগ দিলে উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযোগ বাড়বে; আর ইরান যুক্ত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুন করে হিসাব করতে হবে। ফলে জোট যত বড় হবে, তার কৌশলগত গুরুত্বও তত বাড়বে—কিন্তু একই সঙ্গে সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত, সামরিক দায়বদ্ধতা ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝুঁকিও বাড়বে।
- (মূল প্রতিবেদনটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মার্কিন গণমাধ্যম দ্য মিডিয়া লাইনে ২৮ আগস্ট প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটির তথ্য ও বিশ্লেষণ সংক্ষেপে পুনর্লিখন করা হয়েছে)