রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সাবেক মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার এক নম্বর আসামি শাহরিয়ার মাহমুদসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, শাহরিয়ারকে হামলার কথিত মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) নিউ গিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলাটি করেন। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রকল্পটিতে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে হামলা হয়ে থাকতে পারে।
মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, পূর্বশত্রুতার জেরে শাহরিয়ার মাহমুদের ইন্ধন ও নির্দেশে অন্য আসামিরা এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকল্পে প্রবেশ করেন। তাঁদের হাতে পিস্তল, শটগান, রিভলবার, চাপাতি, রামদা, ছুরি, রড ও লাঠিসোঁটা ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীরা আনুমানিক ৫০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ এখন মামলার এজাহারভুক্ত বক্তব্য; তদন্তে এগুলোর সত্যতা যাচাই হবে।
এজাহারে আরও বলা হয়, হামলাকারীরা প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. পারভেজকে মারধর করেন। রিভলবারের বাঁট দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত এবং ছুরি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে নিরাপত্তাকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলামকেও মারধর করা হয়। তাঁর কাছ থেকে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও ওয়্যারলেস সেট নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলাকারীরা প্রকল্পের প্রধান ফটকেও গুলি চালিয়ে লোহার গেট, থাইগ্লাস ও কাচের অংশ ভাঙচুর করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে অফিসকক্ষে ঢুকে কম্পিউটার, ডিভিআর, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, আসবাবসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়।
এজাহারে নির্মাণসামগ্রী ও নগদ টাকা লুটেরও অভিযোগ রয়েছে। অফিসের লকার ভেঙে নির্মাণসামগ্রী কেনার জন্য রাখা ২৫ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবনের পাশে রাখা রড, তার, পানির পাম্প, নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে মোট ১ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি এবং ১ কোটি ৫০ লাখ ৪৩ হাজার টাকার মালামাল চুরির দাবি করা হয়েছে।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওও। নিউ গিনি প্রপার্টিজের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে স্টুডিওটি পরিচালনা করতেন তিনি। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সেখানে দুটি টেলিভিশন, এসিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আসবাব ভাঙচুর করা হয়েছে। স্টুডিওতে প্রায় ৯৫ লাখ টাকার ক্ষতি এবং বিভিন্ন মালামাল চুরির দাবি করা হয়েছে।
স্টুডিওর প্রতিনিধি ইলার ভাষ্য, হামলার সময় সেখানে দুজন কর্মী ছিলেন। হামলাকারীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা ওয়াশরুমে আশ্রয় নেন। পরে তাঁদের মোবাইল ফোনও নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর দাবি, একটি ক্যামেরা, তিনটি লেন্স, চারটি লাইট, চারটি সফটবক্স ও সিসিটিভি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট হয়েছে। ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজির বিষয়টি তাঁরা জানেন না বলেও জানান তিনি।
প্রকল্পের শ্রমিকদেরও মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক শ্রমিকের দাবি, হামলাকারীরা অস্ত্র নিয়ে শ্রমিকদের কক্ষ থেকে বের করে দেন এবং কয়েকজনকে মারধর করেন। পরে শ্রমিকদের নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি।
নিউ গিনি প্রপার্টিজের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া হামলার পেছনে চাঁদা দাবি ও জমি দখলের অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে এক কোটি, ৫০ লাখ ও দুই কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর সংঘবদ্ধ একটি চক্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন। এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ এখনো কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করেনি।
নাজিম উদ্দিনের দাবি, জমি নিয়ে সাবেক এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর বিরোধ রয়েছে। ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে ১০ কাঠা জমি কেনা এবং পাশের আরও জমি উন্নয়ন করার পর মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, জমি ফেরত চাওয়া ও দখলে বাধা দেওয়ায় তাঁকে চাপে ফেলতে হামলা চালানো হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্যে অবশ্য জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টিই প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম বলেছেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের ধারণা, হাউজিং ব্যবসা এবং জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিবাদ থাকতে পারে। তবে বিবাদমান পক্ষ কারা এবং হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ কী, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয়। চাঁদা দাবির কোনো তথ্য পুলিশের কাছে এই মুহূর্তে নেই বলেও তিনি জানান।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, নিউ গিনি প্রপার্টিজের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তার জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। মামলার এক নম্বর আসামি শাহরিয়ারসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে মো. মামুন ও আসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর রাজধানীর বেইলি রোড এলাকা থেকে শাহরিয়ার মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তাঁকে মামলার এক নম্বর আসামি ও কথিত মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করেছে।
মামলায় নাম থাকা অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মো. আবুল কাশেম, মো. বাবুল হোসেন, মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান, মতিউর রহমান, মজিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, এমকে আজাদ, মো. মামুন, মো. আসলাম ও মুন্না। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এদিকে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সালমান মুক্তাদির প্রথমদিকে হামলাকারীদের চাঁদাবাজ হিসেবে উল্লেখ করে বিএনপির লোকজন জড়িত থাকার অভিযোগ করেছিলেন। তবে পুলিশ বলছে, স্টুডিওটি হামলার মূল লক্ষ্য ছিল না; জমি নিয়ে বিরোধের মধ্যে পড়ে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সালমানের অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কোনো নেতার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর থেকে হামলার পেছনে চাঁদাবাজি, জমি দখল নাকি দুই পক্ষের বিরোধ—এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। মামলার এজাহারে একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থলের আলামত ও মামলার তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হামলার প্রকৃত কারণ এবং জড়িতদের ভূমিকা নির্ধারণ করা হবে।