ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শুক্রবার ভোরে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজিব। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, হুমকি প্রদান এবং নিরাপত্তাকর্মীকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, “সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাদী হয়ে মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও হুমকি প্রদানের অভিযোগ এনে একটি মামলা করেছেন। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।”
মামলার এজাহার অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে ওমরাহ পালন শেষে জামায়াতের ৩৪ জন প্রতিনিধি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় ফেরেন। ওই সময় বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ট্রলি সংগ্রহে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি সরবরাহে দেরি হওয়ায় কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে পড়েন বলে মামলার বিবরণে বলা হয়। একপর্যায়ে সকাল পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান।
নির্বাহী পরিচালক সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে গিয়ে গালিগালাজ ও হুমকি দেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে তিনি নির্বাহী পরিচালককে মারধরের হুমকি এবং “ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার” কথা বলেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাহী পরিচালক পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরিস্থিতির অবনতি আশঙ্কায় সংসদ সদস্য কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন।
এরপর আখতারুজ্জামান উপস্থিত বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আবারও হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলায় তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেঁধে মারধর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনার সময় বিমানবন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন সংশ্লিষ্টদের কেপিআই এলাকায় ভিডিও ধারণ না করার অনুরোধ করেন। তখন আখতারুজ্জামান তাকে গালিগালাজ করে একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, ওই মারধরের ঘটনা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত ছিল না। তবে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে ঘটনাটি প্রমাণ করা সম্ভব বলে বাদী দাবি করেছেন।
পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গেলে তার সঙ্গেও আখতারুজ্জামান অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময় সাধারণ ওমরাহ যাত্রীদের জন্য রাখা জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলার অভিযোগও করা হয়েছে।
ঘটনার একটি ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলতে দেখা যায়। সেখানে তাকে “ঘাড় ধরে বের করে দেব” এবং “মাইর খাইতে চান?”—এ ধরনের কথা বলতে শোনা যায়।
এদিকে জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান ও ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাদের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।
আখতারুজ্জামান রঞ্জন কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে কটিয়াদী আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হন।
এদিকে মামলার অভিযোগের বিষয়ে আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।