মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধ যতই দীর্ঘ ও তীব্র হচ্ছে, সীমান্তের এপারে টেকনাফে তার অভিঘাতও তত গভীর হচ্ছে। স্থলসীমান্তে গোলাগুলি ও বিমান হামলার আতঙ্কের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া বাংলাদেশি জেলেদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি। মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে জেলেদের আটক, নৌযান জব্দ এবং দীর্ঘদিন বন্দি থাকার ঘটনায় টেকনাফের উপকূলীয় পরিবারগুলোতে তৈরি হয়েছে স্থায়ী অনিশ্চয়তা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি আটকের ঘটনা নয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মি ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে। তাঁদের মধ্যে ২২২ জন বাংলাদেশি ও ২১২ জন রোহিঙ্গা। একই সময়ে বিভিন্ন দফায় ৩৪৮ জনকে ফেরত আনা হয়েছে—বাংলাদেশি ১৫৭ জন ও রোহিঙ্গা ১৯১ জন। ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আরও ৮৬ জন আটক ছিলেন; তাঁদের মধ্যে ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা। এক বছরের বেশি সময়ে শত শত জেলে আটক হওয়ার পরও কয়েক ডজন বাংলাদেশি এখনো মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রয়েছেন। তাঁদের সবার বর্তমান অবস্থান, শারীরিক নিরাপত্তা ও আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পরিবারগুলোর কাছে নিয়মিত তথ্য পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
১৯ আগস্ট ২৪ জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনাটি এই সংকটের একটি দিক যেমন দেখিয়েছে, তেমনি অন্য দিকটিও সামনে এনেছে। বিজিবির মাধ্যমে ফেরত আসা ২৪ জনের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি ও ছয়জন রোহিঙ্গা। তাঁদের নাফ নদীর শূন্যরেখা থেকে গ্রহণ করা হয়। ফেরত আসা এক জেলে মোহাম্মদ শফিক জানান, তিনি প্রায় নয় মাস আটক ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা শ্রম দিতে হতো এবং খাবারও ছিল সীমিত; কাজ করতে অস্বীকার করলে মারধরের অভিযোগও করেন তিনি। এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একাধিক দফায় ফিরে আসা জেলেদের বর্ণনায় আটক অবস্থার কঠিন চিত্র উঠে এসেছে।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের কয়েকটি পরিবার এখনো এমন অপেক্ষার মধ্যে রয়েছে। প্রায় ছয় মাস আগে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আরাকান আর্মির ধাওয়ার পর আটক হওয়া নয় জেলের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন—আহমেদ আলী, তাঁর ছেলে নুরুল আবসার ও আবদুর রহিম এবং ভাতিজা মো. হাসান। স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের কোনো নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া যাচ্ছে না। সীমান্তের ওপারে বিমান হামলা ও গোলাগুলির খবর এলেই পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
মার্চেও শাহপরীর দ্বীপের কাছাকাছি নাফ নদীর মোহনা থেকে ১৩ বাংলাদেশি জেলেকে তিনটি নৌযানসহ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনার পর স্থানীয় জেলেদের মধ্যে সমুদ্রে যাওয়ার ভয় আরও বেড়ে যায়। ফেব্রুয়ারিতেও একই এলাকায় পাঁচ জেলেকে আটকের অভিযোগ পাওয়া যায়। তখন বিজিবি জানায়, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। বিজিবি সূত্রে তখন প্রায় ২০০ জেলে আরাকান আর্মির হেফাজতে থাকার আশঙ্কার কথাও সংবাদমাধ্যমে আসে।
এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে রাখাইনে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে আরাকান আর্মির বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দ্রুত সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মংডু দখলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ২০২৬ সালের আগস্টে Institute for Strategy and Policy-Myanmar-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান/আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ এলাকা এবং চিন রাজ্যের পালেতোয়া টাউনশিপ নিয়ন্ত্রণ করছে। টেকনাফের ওপারে এখন যে কর্তৃপক্ষ বাস্তবে সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, তারা মিয়ানমারের স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নয়। এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক জটিলতা। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের ফলে সীমান্তের বড় অংশে তার কার্যকারিতা কমে গেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমারবিষয়ক কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এই সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। মিয়ানমার উইংয়ের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। তবে জেলেদের ফেরত আনার মতো বাস্তব সমস্যায় অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রয়োজন হয়েছে।
সরকার অবশ্য শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেলের ওপর নির্ভর করছে না। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের প্রধান প্রতিনিধির বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সীমান্তের ওপারে যে পক্ষ কার্যকর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বাস্তব প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ করবে। একই সঙ্গে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও বাংলাদেশ জাতিসংঘের মাধ্যমে তাদের জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। জুনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সংসদে জানিয়েছিলেন, রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠায় সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জুলাইয়ে সংসদে বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সামরিক সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে জেলেদের আটক হওয়ার প্রশ্নে এই কূটনৈতিক ভারসাম্য আরও কঠিন। একদিকে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে; অন্যদিকে সীমান্তের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে। আবার আরাকান আর্মিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলে তার কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। ফলে জেলেদের মুক্তির বিষয়টি অনেকটা অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা ও নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সমুদ্রসীমা নিয়ে একটি ভুল ধারণাও দূর করা জরুরি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা আইনগতভাবে অমীমাংসিত নয়। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অব দ্য সি—আইটিএলওএস—২০১২ সালের ১৪ মার্চ রায়ের মাধ্যমে দুই দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের ২০৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার স্থলসীমা, ৬৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার নাফ নদীসীমা এবং ১২ নটিক্যাল মাইল আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা ও ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে।
সমস্যাটি তাই সীমানা নির্ধারণের চেয়ে বেশি **সীমানা বাস্তবে চিহ্নিত ও নিরাপদ রাখার**। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, নদী ও মোহনার অনেক অংশে ভাসমান সীমাচিহ্ন না থাকায় মাছ ধরার সময় সীমারেখা বোঝা কঠিন হয়। জোয়ার-ভাটা, নাব্যতার পরিবর্তন এবং মাছের অবস্থানের কারণে নৌযানও সরে যেতে পারে। একটি গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে নাফ নদীর অগভীরতা ও মাছের সন্ধানে গভীর পানিতে যাওয়ার প্রবণতাকে এই ঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুধু সীমাচিহ্নের অভাব দিয়ে জেলেদের আটককে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ সীমান্তের ওপারে কার্যকর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের পরিবর্তনই সংকটের মূল কাঠামোগত কারণ। আরাকান আর্মি এখন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চলাচল, বাণিজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। বাংলাদেশের জন্য এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে সীমান্তের ওপারে একটি অস্বীকৃত সশস্ত্র কর্তৃপক্ষ বাস্তবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কিছু কার্যক্রমের জায়গা নিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সিটওয়ে কনস্যুলেট প্রধান মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম এর আগে বলেছেন, সীমান্তে উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানো দরকার। তাঁর মতে, সীমান্তে উসকানিমূলক পরিস্থিতি এড়াতে কূটনীতি ও নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমানও সাম্প্রতিক এক আলোচনায় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আরাকান আর্মির সক্ষমতা এবং সীমান্তের ভৌগোলিক দুর্বলতাগুলো বাস্তবভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করেছেন, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি অংশ মিয়ানমারের সংঘাতের প্রভাবের আওতার মধ্যে রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খানও নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। সীমান্ত, রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারকে ঘিরে নিরাপত্তা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তাও রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় এই সংকটকে শুধু জেলে আটকের ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সীমান্ত-শাসনের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন—এমন বিশ্লেষণের সঙ্গে অন্যান্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাখাইনের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর কিয়াউকতাও এলাকায় মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৪৯ জন নিহত ও ৫৮ জন আহত হওয়ার খবর দিয়েছে স্থানীয় উদ্ধারকারী ও আরাকান আর্মি; জাতিসংঘ পরে ঘটনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানায়। রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসংঘের বক্তব্য অনুযায়ী হামলাটি বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় সংঘটিত হয় এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী হামলা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেনি।
জাতিসংঘের Independent Investigative Mechanism for Myanmar-ও ২৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, রাখাইনে পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল; সেখানে বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা, নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও হত্যার মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতি নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য উপযোগী নয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নির্বিচার আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, সম্পত্তি দখল ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগের কথাও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এসেছে।
ফলে বাংলাদেশের জন্য সামনে এখন তিনটি সমস্যা একই সঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া নাগরিকদের নিরাপত্তা। দ্বিতীয়ত, সীমান্তের ওপারে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জায়গায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন।
এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সমাধানের জায়গা রয়েছে জেলেদের নিরাপত্তায়। সমুদ্রসীমা আইনগতভাবে নির্ধারিত হলেও জেলেদের চলাচলের সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় সীমাচিহ্ন, আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, জিপিএস-ভিত্তিক সতর্কতা, প্রশিক্ষণ এবং সীমান্তবর্তী জলসীমায় নজরদারি আরও কার্যকর করা যায় কি না, সেটি এখন গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে আটক জেলেদের একটি কেন্দ্রীয়, নিয়মিত হালনাগাদ তালিকা তৈরি করে তাঁদের পরিবারকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও জরুরি। জেলেদের মুক্তির জন্য যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ইতিমধ্যে কাজে এসেছে, সেটিকে আরও কাঠামোবদ্ধ করা প্রয়োজন। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়েও নির্দিষ্ট মানবিক বিষয়ে যোগাযোগের চ্যানেল তৈরি করা যায় কি না, সেটি কূটনৈতিকভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। কারণ ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারি, মে ও আগস্টে একাধিক দফায় জেলেদের ফেরত আনার ক্ষেত্রে বিজিবির যোগাযোগ ও সমন্বয় কার্যকর হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ৭৩ জন, মে মাসে ১৪ জন এবং আগস্টে ২৪ জনকে ফেরত আনার তথ্য পাওয়া যায়। বিষয়টি শুধু দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত সমস্যা হিসেবে রাখলে এর পরিধি ছোট হয়ে যায়। রাখাইনের সংঘাত এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মানবাধিকার, সীমান্ত নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ, মাদক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন, ভারতসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চাপ তৈরির কথা জানিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলাম আগস্টে বলেন, সরকার ‘নীরব কূটনীতি’র বাইরে গিয়ে জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন ও ভারতের সঙ্গে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার দিকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পূর্ব সীমান্তে একটি স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ ও প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরির কথাও তিনি বলেন।
তবে সীমান্তে শক্ত অবস্থান এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ—দুটিকে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একদিকে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত ও সমুদ্র নজরদারি বাড়াতে হবে; অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বাণিজ্য এবং সীমান্ত স্থিতিশীলতার জন্য মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খোলা রাখতে হবে।
টেকনাফের জেলেদের জন্য সংকটের বাস্তবতা আরও সরল। তাঁদের কাছে বঙ্গোপসাগর কোনো ভূরাজনৈতিক মানচিত্র নয়; সেটিই তাঁদের জীবিকার জায়গা। কিন্তু সেই সমুদ্রেই এখন সীমান্ত, যুদ্ধ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সংকট একসঙ্গে এসে পড়েছে। একজন জেলে মাছ ধরতে গিয়ে সীমারেখা অতিক্রম করলেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর এখন কখনো কখনো তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।
আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় যুদ্ধ যতদিন চলবে, টেকনাফের ঝুঁকিও ততদিন থাকবে। ৬৫ বাংলাদেশি জেলের আটকে থাকার সর্বশেষ প্রকাশ্য বিজিবি-তথ্য তাই শুধু ৬৫টি পরিবারের উদ্বেগের হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তের বদলে যাওয়া বাস্তবতারও একটি সতর্ক সংকেত। সীমান্তের ওপারে কে ক্ষমতায় আছে, সেটি নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের জায়গা সীমিত হতে পারে; কিন্তু নিজের নাগরিকরা কোথায়, কী অবস্থায় এবং কীভাবে নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করবেন—সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশেরই।