দেখাদেখি এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় ছড়িয়েছে বিক্ষোভ; বহিরাগত ও রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ
মজুরি বাড়ানোর দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ছড়িয়ে পড়া পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে দীর্ঘদিনের পরিচিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় এক কারখানার শ্রমিকদের দেখে পাশের কারখানার শ্রমিকরাও কাজে বিরতি দিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। সংগঠিত কর্মসূচি বা কেন্দ্রীয় নির্দেশনার বদলে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারস্পরিক যোগাযোগ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আন্দোলন ছড়িয়েছে।
আন্দোলনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহিরাগত ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ইন্ধনের অভিযোগও উঠেছে। তবে শ্রমিকদের বড় অংশ বলছেন, তাদের রাজপথে নামার প্রধান কারণ মজুরি না বাড়া, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, বাড়িভাড়া, বকেয়া বেতন, ছাঁটাই ও কর্মক্ষেত্রে নিপীড়ন। আন্দোলনের মধ্যে অনুপ্রবেশের অভিযোগকে সামনে এনে শ্রমিকদের প্রকৃত অসন্তোষ আড়াল না করার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক নেতাদের একাংশ।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকায় মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং মিল লিমিটেডের শ্রমিক রেজাউল করিম মঙ্গলবার দুপুরে সহকর্মীদের সঙ্গে সড়ক অবরোধে অংশ নেন। আগের দিনও আন্দোলনে ছিলেন তিনি। সকালে কাজে যোগ দিলেও দুপুরের খাবারের বিরতির পর পাশের কারখানার শ্রমিকদের আহ্বানে বাইরে চলে আসেন।
রেজাউল বলেন, আগের দিন তাদের কারখানার শ্রমিকেরাই প্রথমে আন্দোলনে নেমেছিলেন। পরে আশপাশের কারখানার শ্রমিকেরা যোগ দেন। মঙ্গলবার পাশের একটি কারখানার শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসার পর তারাও রাস্তায় নামেন। শুরুতে পুলিশ বাধা দিলেও পরে তারা সড়কে অবস্থান নেন।
আরেক কারখানার শ্রমিক তাছলিমাও জানান, দুপুরের খাবারের বিরতি পর্যন্ত কাজ করেছেন। এরপর অন্য শ্রমিকদের আন্দোলনে যাওয়ার কথা শুনে তিনিও যোগ দেন। তার ভাষ্য, ন্যায্য দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে চান।
নারায়ণগঞ্জের একটি নিটিং কারখানার ব্যবস্থাপক শামীম হোসেনও শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, পাশের কারখানার শ্রমিকেরা বেরিয়ে গেলে অন্য কারখানার শ্রমিকদের আটকে রাখা কঠিন। কারণ, এক কারখানার শ্রমিকদের স্বজনেরা অন্য কারখানায় কাজ করেন। তাদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আন্দোলনের খবর ছড়াচ্ছে।
শ্রমিকদের সংগঠিত করার বিষয়ে শামীম বলেন, সংগঠন হিসেবে তারা মাঠে নামছেন না। এক কারখানার শ্রমিকেরা বেরিয়ে গেলে অন্য কারখানার শ্রমিকেরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন।
মিরপুরেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে কয়েক দিন ধরে চলা আন্দোলনে শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। শ্রমিকদের ভাষ্য, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর পর নিজেদের মজুরি নিয়েও কারখানাগুলোতে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, বকেয়া বেতন ও ছাঁটাইয়ের বিষয়গুলো যুক্ত হয়েছে।
মিরপুর পল্লবীর কটন জুন লিমিটেডের শ্রমিক আশিকের ভাষ্য, সবকিছুর দাম বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। কারখানাগুলোতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও নতুন মজুরি ঘোষণা করা হয়নি। আরেক শ্রমিকের অভিযোগ, কয়েকটি কারখানায় বেতন বকেয়া রাখা হচ্ছে, কোথাও শ্রমিকদের কালোতালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এসব কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ জমেছে।
সোমবার মিরপুরে আন্দোলনের মধ্যে অন্তত দুটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেডের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এক থেকে দেড় শ লোক কারখানায় হামলা চালিয়ে কাচ ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে। কারখানাটির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান সিরাজুল ইসলামের দাবি, কারখানার শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন। বাইরে থেকে আসা শতাধিক লোক হামলা চালালে শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। এরপরও ভাঙচুর চলে।
কারা হামলা চালিয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি কারখানার কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, আন্দোলনের সময় সব কারখানা বন্ধ রাখার চাপ তৈরি হতে পারে। কোনো কারখানা চালু থাকলে বা সেখানকার শ্রমিকেরা আন্দোলনে যোগ না দিলে অন্যরা হামলা চালাতে পারে।
মিরপুরের কয়েকজন শ্রমিকও আন্দোলনে অপরিচিত লোকজনের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। কাফরুলে বিআরটিএর পেছনে সোমবার দুপুরে জড়ো হওয়া কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে রহমত আলী বলেন, কালশী সড়কের কাছে একটি ভবনে ঢিল ছোড়ার ঘটনায় তাদের এলাকার শ্রমিকদের সঙ্গে অপরিচিত লোকজনকে দেখা গেছে। আজিজুল হাকিমের দাবি, ওই ব্যক্তিরা এলাকার বা কারখানার শ্রমিক নন। তাদের কর্মকাণ্ডের দায় সাধারণ শ্রমিকদের ওপর পড়ছে।
শ্রমিকদের বক্তব্য, তারা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন, ভাঙচুর করতে নয়। আন্দোলনে অপরিচিত লোকজন ঢুকে পড়লে তাদের মূল দাবিও আড়ালে চলে যেতে পারে।
সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব কোথায়
দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসা শ্রমিক সংগঠনগুলোর অনেক নেতা এবার সরাসরি মাঠে নেই। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি এমএ শাহীন বলেন, শ্রমিকেরা দুপুরের পর হঠাৎ করে আন্দোলনে নেমে পড়ছেন। এতে কোনো সংগঠনের নির্দেশনা বা নিয়ন্ত্রণ নেই। আন্দোলনের মধ্যে বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটছে বলে তারা খবর পেয়েছেন।
শাহীন বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের। সরকার ইতোমধ্যে মজুরি কমিশন গঠন করেছে। দ্রব্যমূল্য ও শিল্পমালিকদের সক্ষমতা বিবেচনায় বোর্ড মজুরি নির্ধারণ করবে। এ জন্য সরকারকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। তবে শ্রমিকেরা বিষয়টি বুঝতে চাইছেন না।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে কারখানা ভাঙচুর বা নৈরাজ্য চালালে শ্রমিকদের নিজেদের কর্মসংস্থানের জায়গাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ঘটনার পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের লোকজন বা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী থাকতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্পশ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজনের দাবি, চলমান আন্দোলন শুধু সাধারণ শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলন নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক ও মালিকপক্ষের ইন্ধন রয়েছে। তার অভিযোগ, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা শ্রমিক সেজে মিছিলে ঢুকে স্লোগান দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ তুলে ধরেননি।
অন্যদিকে, গণসংহতি আন্দোলনের শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার মনে করেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে একটি পক্ষ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তার ভাষ্য, সুযোগসন্ধানীরা আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। কিন্তু পুরো আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক দলের উসকানি হিসেবে দেখলে শ্রমিকদের প্রকৃত ক্ষোভ ও বঞ্চনার বিষয়টি আড়াল হয়ে যাবে।
মিরপুরে দীর্ঘদিন কাজ করা এক শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেখানে শ্রমিকদের কোনো কার্যকর নির্বাচিত ইউনিয়ন নেই। ফলে শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরার বা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সংগঠিত কাঠামোও দুর্বল। এ কারণে শ্রমিকেরা নিজেদের মতো করে রাস্তায় নামছেন। মালিকপক্ষ ও শ্রমিক—দুই পক্ষের জন্যই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তার পর্যবেক্ষণ, আন্দোলনে রাজনৈতিক পরিচয়ের কিছু ব্যক্তি অংশ নিতে পারেন। তবে তাদের উপস্থিতি ব্যাপক আকার নিয়েছে—এমন চিত্র তিনি দেখেননি।
আশুলিয়ায় সন্ধ্যার পর আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন
মিরপুর ও গাজীপুরের পাশাপাশি আশুলিয়াতেও কয়েক দিন ধরে আন্দোলন চলছে। তবে সেখানে সন্ধ্যার পর আন্দোলন শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। জিরাবোর নিশ্চিতপুরে আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, অনন্ত গার্মেন্টস ও নিউ ওয়েব গার্মেন্টসের আশপাশ থেকে সন্ধ্যার পর আন্দোলন শুরু হতে দেখা গেছে বলে জানান গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের আশুলিয়া থানার সভাপতি খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা সাধারণত দিনের বেলায় আন্দোলন করেন। রাতে আন্দোলন করে শ্রমিকদের কোনো লাভ নেই। ওই তিন কারখানার আশপাশ থেকে সন্ধ্যার পর কর্মসূচি শুরু হওয়ায় তিনি সন্দেহ করছেন, আন্দোলনের মধ্যে অন্য পক্ষের লোকজন ঢুকেছে।
নিউ ওয়েব গার্মেন্টসের শ্রমিক ইয়াসমিন আক্তার বলেন, শ্রমিকেরা ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে দিনের বেলায় আন্দোলন করেছেন। তাদের হাতে টিফিন ক্যারিয়ার ছাড়া কিছু ছিল না। কিন্তু আন্দোলনের মধ্যে বাঁশ, ইট ও আগুন কীভাবে এল, তা তারা জানেন না। তার দাবি, কিছু লোকের কর্মকাণ্ডে শ্রমিকদের মূল আন্দোলন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
খোরশেদ আলমের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের ভূমিকার কথা বলা হলেও আন্দোলনকে বিপথে নেওয়ার পেছনে অন্য পক্ষের তৎপরতা থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গাজীপুরে ক্ষোভের কারণ জীবনযাত্রার ব্যয়
গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী, নাওজোর ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় কয়েক দিন ধরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। মঙ্গলবারও বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। নাওজোর মোড়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৩৫ বছর বয়সী শ্রমিক আবদুল হাকিম বলেন, মজুরি না বাড়ালে অন্তত দ্রব্যমূল্য ও বাড়িভাড়া কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তার অভিযোগ, যে বাসার ভাড়া আগে তিন হাজার টাকা ছিল, তা বেড়ে ছয় হাজার টাকা হয়েছে। আন্দোলনের মধ্যেও বাড়িভাড়া বাড়ানোর সংকেত দিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা।
চৌধুরী বাড়ি এলাকার পেনাসিয়া ক্লোথিং লিমিটেড মঙ্গলবার সকালে খোলা থাকলেও কয়েক ঘণ্টা পর শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। সেখানকার শ্রমিক আসাদুল বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন হওয়ার পরও সমাধানের বিষয়ে শ্রমিকেরা পর্যাপ্ত আশ্বাস পাচ্ছেন না।
গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাস বলেন, সোমবার অনেক শ্রমিক জানতেন না যে কারখানা বন্ধ থাকবে। সকালে কাজে এসে কারখানা বন্ধ দেখে তারা আন্দোলনে যোগ দেন। তার ভাষ্য, ওভারটাইমসহ মাসে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা আয় করেও শ্রমিকদের পক্ষে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা বাড়িভাড়া দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। এর সঙ্গে ছাঁটাই ও কারখানার ভেতরে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
সত্যজিৎ বিশ্বাস মনে করেন, শ্রমিকদের নেতৃত্বের ঘাটতি থাকায় আন্দোলনে সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের ঢুকে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তার মতে, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিই শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নামার প্রধান কারণ।
মজুরি বোর্ড গঠন ও কার্যকরের সময় নিয়ে অসন্তোষ
সাধারণত পাঁচ বছর পরপর নতুন মজুরি বোর্ড গঠন ও বেতন পুনর্নির্ধারণের সময় শ্রমিকদের আন্দোলন তীব্র হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন সংশোধন করে তিন বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ছিল। সেই হিসাবে চলতি বছরের মে মাসে বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করতে হলে মে মাসেই বোর্ড গঠন করা দরকার ছিল। দেরি হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আইবিসি শ্রমিকদের জন্য ৩২ হাজার টাকা মজুরি দাবি করেছে। তবে বোর্ড গঠনের পর সরকারকে সময় দেওয়ার পক্ষেই মত তার।
সালাউদ্দিন স্বপনের আশা, আগামী মাসের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব। তবে আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের উসকানি রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার দাবি, বহিরাগত ব্যক্তিরা কারখানায় ঢিল ছুড়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করছেন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে থাকা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, সাধারণত প্রস্তাবিত মজুরি ঘোষণার পর শ্রমিকদের আন্দোলন তীব্র হয়। এবারের আন্দোলনের নেতৃত্বে তার সংগঠন নেই।
শঙ্কায় পোশাকশিল্প মালিকেরা
চলমান আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির সহসভাপতি মো. রিজওয়ান সেলিম বলেন, সরকার প্রথমে বিষয়টিকে মজুরিসংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখলেও পরে রাজনৈতিক সমস্যা বলছে। তার মতে, পোশাক খাতকে ব্যবহার করে আন্দোলন করা হচ্ছে কি না, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। বিজিএমইএর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান সেলিমের দাবি, আন্দোলনে পরিচিত শ্রমিক নেতাদের সরাসরি উপস্থিতি না থাকলেও কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে উসকানি দিচ্ছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় বেতন পরিশোধ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি। তার আশঙ্কা, মাসের সাত তারিখের পর বেতন দেওয়ার সময় এলে নতুন করে সংকট তৈরি হতে পারে। অনেক কারখানা সকালে খুললেও নিরাপত্তার কারণে শ্রমিকদের ছুটি দিতে হচ্ছে। কারখানার সামনে লোকজন জড়ো হলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন তাই একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মক্ষেত্রের বঞ্চনার বাস্তবতা সামনে এনেছে, অন্যদিকে নেতৃত্বের দুর্বলতা ও বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্দোলনে কারা ইন্ধন দিচ্ছে, তা তদন্তের বিষয়। তবে শ্রমিকদের মজুরি, বকেয়া বেতন, বাড়িভাড়া ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নগুলোর সমাধান না হলে অসন্তোষ কাটবে না—এমন মত শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অনেকেরই।