এআই দিয়ে অশ্লীল ছবি-ভিডিও তৈরির অভিযোগ সহপাঠীর বিরুদ্ধে; প্রতিবাদ করায় ১০–১২ শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি স্থগিতের দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চাপ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন তারা।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিবাদকারীদেরই শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি স্থগিত করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই, হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’—এমন বিভিন্ন দাবি ও স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে বিদ্যালয়ের মাঠে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাঁরা অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর শাস্তি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে স্লোগান দেন। আন্দোলন চলাকালে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিনিধিকে সেখানে দেখা যায়নি।
জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সহপাঠী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, এআই ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দেওয়ার প্রতিবাদ করায় তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁরা আরও দাবি করেন, অভিযুক্তের পারিবারিক পরিচয়ের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, প্রক্টর অফিস ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফ রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা অধ্যাপক মো. মোফাজ্জল হোসেন তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে পাল্টা ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, গত ৭ অক্টোবর কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর ছেলেকে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে পলাশী ও আজিমপুর এলাকায় নিয়ে মারধর করে। এতে তাঁর ছেলে গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরদিন এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি।
অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে তাঁদের আলাদা কক্ষে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এরপর তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগসংবলিত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও জানান।
তাঁর ভাষ্য, তাঁর ছেলের সঙ্গে অভিযোগকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর একসময় বন্ধুত্ব ছিল। পরে একটি ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডিতে লেখালেখিকে কেন্দ্র করে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো এবং টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তাঁর ছেলের বক্তব্য অনুযায়ী, টাকা দেওয়া বন্ধ করে ওই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরই তাঁকে মারধর করা হয়।
অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন আরও জানান, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তাঁর ছেলেকেও তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছিল। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বর্তমানে তাঁরা ছেলেকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে অ্যাসাইনড নই। স্কুল কর্তৃপক্ষই এসব বিষয় দেখবে। তবে সেখানে যাতে কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, এ জন্য আমরা প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের পাঠিয়েছি। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’
একদিকে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ও এআই ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি-ভিডিও তৈরির অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ওপর হামলা, ভয়ভীতি ও অর্থ আদায়ের পাল্টা দাবি—দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কনটেন্টের উৎস এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।