মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও পেশির চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করতে পারে ছোট সেন্সর; ভবিষ্যতে অ্যাপলের স্বাস্থ্য ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিতে এর ব্যবহার হতে পারে
বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির অধ্যাপক সাইফ সালাহউদ্দিনের সহ-প্রতিষ্ঠিত গভীর প্রযুক্তির (ডিপ-টেক) স্টার্টআপ ‘সোনেরা ম্যাগনেটিক্স’ কিনে নিয়েছে অ্যাপল। মানবদেহ থেকে অত্যন্ত দুর্বল চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম এই প্রযুক্তি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এর ফলে অ্যাপলের স্বাস্থ্য ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিতে নতুন ধরনের বায়োমেট্রিক সেন্সিং যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সোনেরা ম্যাগনেটিক্স প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। প্রতিষ্ঠানটি এমন ছোট আকারের ম্যাগনেটিক সেন্সর তৈরি করেছে, যেগুলো মানুষের মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও পেশির বৈদ্যুতিক কার্যক্রমের সঙ্গে তৈরি হওয়া চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করতে পারে। প্রচলিত ব্যবস্থায় এ ধরনের সংকেত পরিমাপ করতে বড় আকারের যন্ত্র, বিশেষায়িত পরিবেশ এবং জটিল অবকাঠামোর প্রয়োজন হতে পারে। সোনেরার লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিটিকে তুলনামূলক ছোট, কম জটিল ও বহনযোগ্য করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, অ্যাপল ২০২৬ সালের মে মাসে সোনেরার নির্দিষ্ট কিছু সম্পদ অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মীকে অ্যাপলে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে অধিগ্রহণের আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি। অ্যাপল বা সোনেরা—কোনো পক্ষই আলাদাভাবে এ লেনদেনের ঘোষণা দেয়নি।
এই অধিগ্রহণের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগসূত্র তৈরি হয়েছে সাইফ সালাহউদ্দিনের কারণে। তিনি সোনেরার তিন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত হন তিনি। পরে যোগ দেন ইউসি বার্কলিতে।
সালাহউদ্দিন ২০০৩ সালে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০০৮ সালে ইউসি বার্কলির তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন।
বর্তমানে তিনি ইউসি বার্কলির টিএসএমসি ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর অব ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্সেস এবং লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সিনিয়র ম্যাটেরিয়াল সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক ডিভাইস, উপকরণ, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং শক্তি-সাশ্রয়ী কম্পিউটিং। তিনি আইইইই, আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি ও আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের ফেলো।
সোনেরার প্রযুক্তির মূল ধারণাটি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হয়—মানবদেহের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম কীভাবে চৌম্বকীয় সংকেত তৈরি করে।
মানুষের নিউরন সক্রিয় হলে কিংবা কোনো পেশি সংকুচিত হলে সেখানে বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি হয়। সেই বৈদ্যুতিক প্রবাহের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্বল চৌম্বকক্ষেত্রও তৈরি হয়। তাত্ত্বিকভাবে শরীরের বাইরে থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল সেন্সরের সাহায্যে সেই চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব।
এখানেই সোনেরার প্রযুক্তির বিশেষত্ব। ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি বা ইইজি এবং ইলেকট্রোমায়োগ্রাফি বা ইএমজির মতো প্রচলিত প্রযুক্তি মূলত বৈদ্যুতিক কার্যক্রম পরিমাপ করে। সোনেরা তার বদলে সংশ্লিষ্ট চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার দিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
সমস্যা হলো, মানুষের শরীর থেকে তৈরি হওয়া এই চৌম্বকীয় সংকেত অত্যন্ত দুর্বল। প্রচলিত ম্যাগনেটোএনসেফালোগ্রাফি বা এমইজি ব্যবস্থায় মস্তিষ্কের সংকেত ধরতে অত্যন্ত সংবেদনশীল সেন্সরের পাশাপাশি বিশেষ চৌম্বকীয় শিল্ডিং এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুলিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ফলে এসব প্রযুক্তি সাধারণত বড় ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা বা গবেষণাকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সোনেরা এই জায়গাটিতেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ ঘরের তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে এমন তুলনামূলক ছোট ম্যাগনেটোমিটার তৈরি করেছে। তাদের প্রযুক্তিতে শব্দতরঙ্গ-চালিত ফেরোম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ব্যবহার করে দুর্বল চৌম্বকক্ষেত্র শনাক্ত করার পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।
সোনেরার প্রথম প্রকাশ্য পণ্যগুলোর একটি হলো ‘এস১ চিপ’। এটি মূলত পেশি থেকে উৎপন্ন চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার জন্য তৈরি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ত্বকের সঙ্গে সরাসরি ইলেকট্রোড সংযুক্ত না করেও এর মাধ্যমে পেশির কার্যক্রম পরিমাপ করা সম্ভব।
এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারও বেশ বিস্তৃত। কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, নিউরোমাসকুলার পর্যবেক্ষণ, রোগের বায়োমার্কার শনাক্তকরণ এবং খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রে এর ব্যবহার হতে পারে। একই সঙ্গে জেসচার বা অঙ্গভঙ্গি শনাক্তকরণ, মুখের পেশির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং নীরব কথা বা অস্ফুট উচ্চারণ শনাক্ত করার মতো প্রযুক্তিতেও এর সম্ভাবনা রয়েছে।
এই শেষের ক্ষেত্রটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির জন্য। কারণ পেশির সূক্ষ্ম সংকেত শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতের স্মার্টওয়াচ, স্মার্ট গ্লাস বা ইয়ারবাড ব্যবহারকারীর অঙ্গভঙ্গি কিংবা নির্দিষ্ট পেশির নড়াচড়া বুঝতে পারবে। ফলে প্রচলিত স্পর্শ, বোতাম বা কণ্ঠনির্ভর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নতুন ধরনের মানব-ডিভাইস ইন্টারফেস তৈরি হতে পারে।
সোনেরা শুধু পেশির সংকেতেই থেমে থাকেনি। স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার প্রযুক্তি নিয়েও তারা কাজ করেছে। লক্ষ্য ছিল নিউরোইমেজিংয়ের জন্য ব্যবহৃত বড় ও ব্যয়বহুল ব্যবস্থার আকার, শক্তি ব্যবহার এবং খরচ কমিয়ে আনা।
২০২৩ সালে অ্যামপ্লিফাই পার্টনার্সের নেতৃত্বে সোনেরা ১১ মিলিয়ন ডলারের সিড ফান্ডিং সংগ্রহ করে। তখন প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এর আগে-পরে মিলিয়ে মোট মূলধন সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার। স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত কম্পিউটিং, স্মার্ট পোশাক এবং নিউরোথেরাপিউটিক্স—বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যবহারের কথা তখন তুলে ধরা হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন, অ্যাপল কেন এই প্রযুক্তিতে আগ্রহী
অ্যাপল কয়েক বছর ধরে অ্যাপল ওয়াচকে শুধু সময় দেখার বা ফিটনেস ট্র্যাকিংয়ের ডিভাইস হিসেবে নয়, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলছে। হৃদস্পন্দন, রক্তে অক্সিজেন, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিশ্লেষণ দেওয়ার দিকে প্রতিষ্ঠানটির জোর বাড়ছে।
সোনেরার প্রযুক্তি এখানে একটি ভিন্ন ধরনের তথ্যের উৎস খুলে দিতে পারে। বর্তমানে অধিকাংশ পরিধানযোগ্য ডিভাইস হৃদস্পন্দন, তাপমাত্রা, গতি বা ত্বকের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের মতো সংকেতের ওপর নির্ভর করে। সোনেরার সেন্সর ব্যবহার করা গেলে পেশি ও স্নায়ুর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত চৌম্বকীয় সংকেতও ভবিষ্যতে পরিমাপের আওতায় আসতে পারে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। অ্যাপল সোনেরার প্রযুক্তি ঠিক কোন পণ্যে ব্যবহার করবে, বা আদৌ কোনো বাজারজাত পণ্যে এটি কবে ব্যবহার করা হবে—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তাই এটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত পণ্য-পরিকল্পনা হিসেবে নয়।
ইউরোপীয় অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত তথ্য থেকে যেটি নিশ্চিত হওয়া যায়, তা হলো সোনেরার নির্দিষ্ট কিছু সম্পদ অ্যাপলের হাতে গেছে এবং প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মী অ্যাপলে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু চুক্তির মূল্য কিংবা প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ পণ্যভিত্তিক ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
সোনেরার গল্পটি তাই শুধু একটি স্টার্টআপ বিক্রি হয়ে যাওয়ার গল্প নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, সেমিকন্ডাক্টর ও ম্যাগনেটিক সেন্সিং প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগ মিলিয়ে তৈরি একটি প্রযুক্তি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় ভোক্তা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে পৌঁছেছে। আর সেই গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র একজন বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও গবেষক সাইফ সালাহউদ্দিন।
সোনেরার প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত অ্যাপল ওয়াচে জায়গা পাবে, নাকি স্মার্ট গ্লাস, ইয়ারবাড কিংবা সম্পূর্ণ নতুন কোনো স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হবে—তা এখনো অজানা। তবে মানবদেহের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম থেকে তৈরি অত্যন্ত দুর্বল চৌম্বকীয় সংকেতকে ছোট সেন্সরের মাধ্যমে ধরার যে প্রযুক্তি সোনেরা তৈরি করেছে, সেটিই অ্যাপলের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির জন্য নতুন সম্ভাবনার একটি দরজা খুলে দিয়েছে।
সূত্র : এক্সিটস্ট্যাক