এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া, একেকটি আয়োজনে লাখ টাকা; মাদকসহ ৮৪ জন আটক, পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত মালিক
রাজধানীর ভাটারায় এক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) মালিকানাধীন তিনতলা বাড়িতে রাতভর ডিজে পার্টি, মাদক সেবন ও কথিত অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ উঠেছে। অনলাইনে এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষসহ ৮৪ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। অভিযানে মদ, গাঁজা, ইয়াবা ও নেশাদ্রব্য সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর বাড়ির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভাটারা থানাধীন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ এলাকায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির একাংশে বাড়িটি নির্মিত। এয়ারবিএনবি প্ল্যাটফর্মে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হতো। বাড়ি দেখভালের জন্য মাহবুব আলম নামের একজনকে কো-হোস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন জহির। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন পার্টির নামে সেখানে মাদক সেবনসহ নানা কর্মকাণ্ড চলত। অনলাইনে বাড়ি ভাড়া দিয়ে অর্জিত আয়ের ৭০ শতাংশ জহিরের অ্যাকাউন্টে জমা হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
সোমবার গভীর রাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে অভিযান চালায় ডিবির উত্তরা বিভাগ। অভিযানে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়েও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিকও রয়েছেন।
পাঁচ কক্ষের বাড়ি, একেক আয়োজনে লাখ টাকা
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বলেন, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এর বাড়িটিতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলার তথ্য পেয়ে অভিযান চালানো হয়। সেখানে উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা ডিজে পার্টির নামে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়াত বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে মদ, গাঁজা, কনডম ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য পাওয়া গেছে।
ডিসি ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে মোট পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। অনলাইনে কক্ষগুলো বুকিং দেওয়া হতো। একেকটি কক্ষ ১০ জন মিলে ভাড়া নিতেন। এর বাইরে অতিরিক্ত লোকজন থাকলে জনপ্রতি ৬০০ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হতো। দুপুর ১২টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা বা ১১টা পর্যন্ত এসব আয়োজন চলত বলে জানান তিনি। মাসে ১৮ থেকে ২০টি আয়োজন হতো এবং প্রতিটি আয়োজন থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ভাড়া পাওয়া যেত বলে তাঁর বক্তব্য।
ডিবি সূত্র জানায়, অভিযানকালে গাঁজা, ইয়াবা, মদ, কনডম এবং ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সদর দপ্তরে সংযুক্ত বাড়ির মালিক
ঘটনার পর মঙ্গলবার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সই করা অফিস আদেশে আব্দুল্লাহ আল জহিরকে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
এদিকে তাঁর মালিকানাধীন বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে এমন কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ এবং ভাটারা এলাকায় সাড়ে ছয় কাঠা জমি কেনার অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জমি কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এ প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের মধ্যে নেই।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, তিনি অনলাইনে বাড়িটি ভাড়া দিয়ে থাকেন এবং ভাড়ার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়মও রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘সেখানে কোনো অবৈধ কাজ হয়ে থাকলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই আমার। তবে অসৎ উদ্দেশ্যে আমি বাড়ি ভাড়া দিতাম না।’ জহির আরও বলেন, দেশ-বিদেশের অনেকেই বাড়িটি ভাড়া নেন। কেউ অসামাজিক কর্মকাণ্ড করতে চাইলে অতীতে তা প্রতিহত করা হয়েছে। এবার জন্মদিনের পার্টির কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা মদ আনবেন বা অন্য কর্মকাণ্ডে জড়াবেন, তা তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াত আমিরের প্রশ্ন
এ ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, পুলিশে কর্মরত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানাধীন বাড়ি থেকে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৮৪ জন নারী-পুরুষকে আটক এবং মাদক উদ্ধারের ঘটনা থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র বোঝা যায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, লুণ্ঠন ও ডাকাতি বেড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার কথাও তুলে ধরে তিনি জনদুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তরুণদের আবারও জেগে ওঠার আহ্বানও জানান জামায়াত আমির।
একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার মালিকানাধীন বাড়িতে এমন অভিযোগ ও অভিযান পুলিশি তদারকি, ভাড়াবাড়ির ব্যবস্থাপনা এবং অনলাইন বুকিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত আয়োজনগুলোর ওপর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এবং বাড়ির মালিকের দায় নির্ধারণ হবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।