সচ্ছল জীবনের আশায় বিদেশে যেতে চেয়েছিলেন রাজধানীর খিলক্ষেতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এনামুল হাসান (৩৯)। বছরখানেক আগে দালালের কথায় বিশ্বাস করে সাড়ে ১১ লাখ টাকা খুইয়েও দমে যাননি তিনি। পরে নিকুঞ্জ এলাকার একটি এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এবার স্পেনে কর্মসংস্থানের আশ্বাসে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই তাঁকে ঠেলে দিয়েছে ভয়াবহ বিপদের মুখে। পরিবারের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ একটি চক্র স্পেনে পাঠানোর কথা বলে তাঁকে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করেছে। এখন তাঁকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে।
গত ৭ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে এনামুলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে চক্রের সদস্যরা। বুধবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি তাঁদের কবজায় রয়েছেন বলে পরিবারের দাবি। তাঁকে উদ্ধারে খিলক্ষেত থানায় অভিযোগ করেও কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর স্ত্রী হেপি আক্তার ও স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, পুলিশ মামলা নেয়নি; বরং অভিযোগ প্রত্যাহার করে চক্রের সঙ্গে সমঝোতার পরামর্শ দিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্ন শুনে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।
এদিকে এনামুলের পরিবারকে দফায় দফায় ফোন, বার্তা ও অডিও বার্তা পাঠিয়ে আতঙ্কিত করে রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বুধবার সন্ধ্যায়ও তাঁর স্ত্রীকে বার্তা পাঠিয়ে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) নম্বরে টাকা দাবি করা হয়। পাশাপাশি দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের হিসাব নম্বরও পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
অভিযোগ থেকে জিডি, মুক্তিপণ ১৯ লাখ টাকা
এনামুলের স্ত্রী হেপি আক্তার সোমবার খিলক্ষেত থানায় চারজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে জাহাঙ্গীর, রিয়াজ, হারুন ও সায়মনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবারের দাবি, লিখিত অভিযোগের মূল বক্তব্য কাটছাঁট করে পুলিশ সেটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করেছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করে স্পেনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত ৭ অক্টোবর রাতে খিলক্ষেতের বাসা থেকে বের হন এনামুল। পরে মোবাইল ফোনে তিনি পরিবারকে জানান, তিনি দুবাইয়ে আছেন। সেখান থেকে মরক্কো হয়ে তাঁকে স্পেনে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, স্পেনে নেওয়ার পরিবর্তে তাঁকে প্রতারণার মাধ্যমে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এরপর গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর একাধিক মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে এনামুলকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ১৯ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে অভিযুক্তরা তাঁকে গালাগাল করেন এবং হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় অন্য একটি নম্বর থেকে আবার ফোন করে সাড়ে চার লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে দাবির পরিমাণ কমিয়ে আপাতত দুই লাখ টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে এনামুলের ক্ষতি করা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় দিন কাটছে তাঁর স্বজনদের।
তবে থানায় নথিভুক্ত জিডির বিবরণে ঘটনার ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে বলে দাবি পরিবারের। তাঁদের ভাষ্য, জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, খিলক্ষেতের তেঁতুলতলা থেকে চট্টগ্রাম অফিসে যাতায়াতের সময় এনামুল নিখোঁজ হন। ৭ অক্টোবর সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে তাঁর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে সেখানে লেখা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগের বক্তব্যের সঙ্গে জিডির বিবরণে এমন পার্থক্য কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত না করে ঘটনাটিকে নিখোঁজ হওয়ার সাধারণ ঘটনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
জিডি প্রত্যাহারে চাপ দেওয়ার অভিযোগ
হেপি আক্তার জানান, স্বামীকে লিবিয়ায় আটকে রাখা হয়েছে বলে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে জানানো হচ্ছে। তাঁকে মুক্ত করতে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হচ্ছে। মঙ্গলবার মধ্যরাতে অডিও বার্তা পাঠিয়ে তাঁর স্বামীকে দিয়ে জিডি প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। হ্যাপির দাবি, অভিযুক্তরা প্রথমে ১৯ লাখ টাকা চাইলেও পরে দাবির পরিমাণ কমিয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা করেছে। এখন অন্তত দুই লাখ টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু টাকা দিলেই স্বামীকে নিরাপদে ফেরত পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই তিনি অভিযোগ প্রত্যাহার করতে রাজি নন।
স্বামীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হ্যাপি বলেন, যেকোনো উপায়ে তাঁর স্বামীকে খুঁজে বের করতে হবে। তাঁকে উদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপও কামনা করেন তিনি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এনামুলকে উদ্ধারের পরিবর্তে পুলিশ উল্টো পরিবারকে জিডি প্রত্যাহার করতে বলছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর চাচা জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর ভাষ্য, এসআই সাইদুর রহমান তাঁদের থানায় ডেকে নিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে সমঝোতা করে টাকা দিয়ে ভাতিজাকে ছাড়িয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “তিনি (এসআই সাইদুর) আমাদের থানায় ডেকে নিয়ে অপরাধীদের সঙ্গে সমঝোতা করে টাকা দিয়ে ভাতিজাকে ছাড়িয়ে আনতে বলছেন। এটা কোন ধরনের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা? আবার টাকা দিলেই যে মানুষটিকে নিরাপদে ফেরত পাওয়া যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।”
পরিবারের দাবি, চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সরাসরি ফোন করছে এবং খিলক্ষেত এলাকায় তাদের অবস্থান রয়েছে বলেও জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নম্বরগুলোর সূত্র ধরে তদন্ত ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ নম্বরগুলো শনাক্ত করার উদ্যোগ না নিয়ে এনামুল দুবাই বা লিবিয়ায় আছেন বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং বিদেশে নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগটি এখন এনামুলের পরিবারের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারের দাবি, তাঁকে দ্রুত উদ্ধারে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, অভিযুক্তদের শনাক্ত এবং অর্থ দাবিতে ব্যবহৃত ফোন নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের সূত্র ধরে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।