জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকরের দাবি; মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে আপত্তি
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোর কয়েকটির কার্যকারিতা হারানোর পর পৃথক পৃথক বিল আনার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। দলটির দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে আইন পাসের মাধ্যমে ‘খণ্ডিত সংস্কার’ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হতে চায় না।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি সরকারের সংস্কার কার্যক্রম, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশের পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
পরে রাত ৮টা ৬ মিনিটের দিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
‘খণ্ডিত প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না’
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তারা পূর্ণাঙ্গ সংস্কার চান এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার অংশ তারা হবেন না। তিনি বলেন, আমরা পুরা সংস্কার চাই, আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন চাই এবং আমরা এইভাবে খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না।” ওয়াকআউটের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এই পর্বে তারা সংসদ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। উপযুক্ত সময়ে আবার সংসদে ফিরে এসে জনগণের পক্ষে কথা বলবেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
রাষ্ট্রসংস্কারে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের দাবি, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন। তবে সেই রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না হওয়ায় সংসদের শুরু থেকেই বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে জানান শফিকুর রহমান। তার ভাষ্য, সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষই গণভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়ায় মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধ
গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সরকারি দলের সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দল শুরু থেকেই এ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে আসছে।
গত ১৩ জুলাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাসের সময় গণভোটের রায় ‘বাইপাস’ করার অভিযোগ তুলে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল। ওই কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ৪ আগস্ট। বিরোধী দল এতে অংশ নেয়নি।
১৩৩ অধ্যাদেশ নিয়েও বিরোধ
বিরোধীদলীয় নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রসঙ্গও সংসদে তুলে ধরেন। তার অভিযোগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, পুলিশ সংস্কার ও নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে দেওয়া হয়েছে।
সংসদের বিশেষ কমিটি এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধন করে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছিল। আরও ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয় এবং সাতটি অধ্যাদেশ রহিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
১০ এপ্রিল পর্যন্ত ছয় দিনে ৯১টি বিল পাস করে মোট ১২০টি অধ্যাদেশের সাংবিধানিক নিষ্পত্তি করে সংসদ। ওই প্রক্রিয়ায় আরও কিছু অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর পথে যায়।
মানবাধিকার কমিশন বিলেও বিরোধী দলের আপত্তি
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে আগেও সংসদে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। গত ৯ এপ্রিল বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহাল করা হয়। সরকার তখন জানিয়েছিল, আরও যাচাই-বাছাই করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জন্য শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করা হবে। এরপর গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভা নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন করে। বৃহস্পতিবার সংসদে সেই নতুন বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার।
বিরোধী দলের আপত্তির অন্যতম কারণ হিসেবে আগের অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়টিও তুলে ধরেন শফিকুর রহমান।
গুম প্রতিরোধ বিল নিয়েও প্রশ্ন
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়েও বিরোধী দলের আপত্তি রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে ওই অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করা হয়। ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের পর অধ্যাদেশটি সরাসরি আইনে পরিণত না করে নতুন করে বিল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৫ এপ্রিল সংসদে জামায়াতের সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমান অধ্যাদেশটি আগে আইনে পরিণত করে পরে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের দাবি জানিয়েছিলেন। আইনমন্ত্রী তখন আরও যাচাই-বাছাই করে যুগোপযোগী বিল আনার কথা জানিয়েছিলেন।
বিশেষ অধিবেশন না ডাকায় ক্ষোভ
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের দাবিও পুনরায় সামনে আনেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আলোচনা করতে বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। চিঠির অনুলিপি স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর কাছেও দেওয়া হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং, ভুতুড়ে বিল ও গ্যাস সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি সমস্যার কারণে শিল্পকারখানাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
‘চব্বিশের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সংসদ’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে গতানুগতিক সংসদ হিসেবে দেখতে চান না বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, এই সংসদ ‘চব্বিশের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভিন্নধর্মী সংসদ’। তাই সংসদের শুরু থেকেই দেশের জন্য একটি ‘ফ্রেশ স্টার্ট’-এর প্রত্যাশা ছিল। তার মতে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ার পরও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না হওয়ায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
‘সংস্কারের মূল দাবি চাপা দেওয়ার চেষ্টা’
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন বিল সংসদে এনে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের মূল দাবি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এইসব কিছুতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সংসদকে ঠেলে একতরফাভাবে, একপেশে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।” তার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে সংস্কারের মূল দাবি চাপা পড়ে যাবে। বিরোধী দল সেটি মেনে নেবে না।
সংবিধান সংশোধন কমিটিতে কেন নেই বিরোধী দল
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেওয়ার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে বারবার কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তাদের অবস্থান পরিষ্কার। তারা সংবিধান ‘সংশোধন’ নয়, গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংস্কার পরিষদ’ চায়। সরকার গত ২৯ এপ্রিল সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। বিরোধী দল তখন ‘ধারণাগত পার্থক্যের’ কথা বলে কমিটিতে সদস্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে।
বৃহস্পতিবার সরকারি বিল উত্থাপন নিয়েও প্রশ্ন
বৃহস্পতিবার সরকারি বিল উত্থাপনের বিষয়েও আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তার দাবি, সংসদের কার্যপ্রণালি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের জন্য নির্ধারিত দিন হলেও এদিন সরকারি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মন্ত্রী ছাড়া সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বেসরকারি সদস্য হিসেবে বিল আনতে পারেন। বেসরকারি সদস্যদের একাধিক বিল অপেক্ষমাণ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো বাদ দিয়ে সরকারি বিল উত্থাপন করায় তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
আবারও ওয়াকআউট, ভবিষ্যতে ফেরার ঘোষণা
সবশেষে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন শফিকুর রহমান। বিরোধী দলের বক্তব্য, সংস্কার হতে হবে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ। বিচ্ছিন্নভাবে আইন পাস করে সংস্কারের মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার কোনো প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নেবে না। সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিরোধীদলীয় নেতা জানান, জনগণের স্বার্থে প্রয়োজন হলে তারা আবার সংসদে ফিরে এসে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন।