আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ কর্মসূচি থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগসহ চার দফা দাবি জানাবে দলটি। পরে সারা দেশেও গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধন করে এসব ঘোষণা দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যর্থতার দায় নিয়ে দুই মন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে এনসিপি মনে করে। অন্যদিকে যুদ্ধের অজুহাতে তিন দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘সার্বিকভাবে ব্যর্থতার দায়ে অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে।’ আপাতত এই দুই মন্ত্রীকে সরিয়ে মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, এর আগে তথ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কিছুদিন আগে একজন প্রতিমন্ত্রীকেও দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। তবে কেন তাঁদের সরানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, যেসব মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি অবহেলা ও ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না।
দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি নিয়ে ক্ষোভ
কারওয়ান বাজারে গণসংযোগ কর্মসূচি শুরুর কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচাবাজারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগ শোনা যায়। কয়েক মাস আগেও বাজারের ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধভাবে চাঁদাবাজদের প্রতিহত করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। সারা দেশে সিন্ডিকেট, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ—এই চারটি বিষয় সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মানুষ বাজারে গিয়ে এক বা দুই ধরনের বেশি সবজি কিনতে পারছে না। মধ্যবিত্ত পরিবার আগে মাসে যত ডিম খেত, এখন তা অর্ধেকও পারছে না।’
জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি এলপিজির দাম নিয়েও অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচনের পর এলপিজির দাম ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে। অথচ বাজারে তা আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানিমন্ত্রীকে এ বিষয়ে যথাযথভাবে কথা বলতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সন্ত্রাস ও মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, অথচ সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকায় ৬০টি যানবাহন ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার ও মানবাধিকার আইন বাতিলের দাবি
এনসিপির চার দফা দাবির মধ্যে সংবিধান সংস্কার, সাইবার আইন সংশোধনের প্রস্তাব এবং মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি আইন বাতিলের বিষয়ও রয়েছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রহসন করার জন্য একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি অবিলম্বে বিলুপ্ত করে গণভোটের গণরায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সেই পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর মতে, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ে যেসব সংস্কার ও জবাবদিহির প্রত্যাশা উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
সাইবার আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিরোধিতা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এ সংশোধনী সংসদে কোনোভাবেই পাস হতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার কমিশন-সংশ্লিষ্ট আইনসহ যেসব আইনকে তাঁরা কর্তৃত্ববাদী বলে মনে করেন, সেগুলো বাতিলের দাবি জানান তিনি।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
জুলাই গণহত্যা এবং গুম-খুনের বিচার কার্যক্রমের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থেকেই তাঁরা এসব ঘটনার বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও এর বাস্তবায়ন তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না। বিভিন্ন স্থানে জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের ওপর হামলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান এনসিপির আহ্বায়ক।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে এবং বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং নেত্রকোনায় সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এসব পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
শাহবাগ থেকে সারা দেশে কর্মসূচি
নাহিদ ইসলাম জানান, আগামী ৩০ অক্টোবর শুক্রবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। চার দফা দাবি আদায়ে তিনি জনগণকে ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। ঢাকা মহানগরে কর্মসূচি পালনের পর সারা দেশেও গণবিক্ষোভের আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি। শুক্রবারের লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এনসিপির নেতারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে তাঁদের এ কর্মসূচি। এসব দাবিতে সরকারের পদক্ষেপ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তাঁরা।