জীবনচরিত

সংগ্রামের বর্ণিল চরিত্র মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ

আহমাদ বিন আব্দুস সালাম
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯
 ছবি:

মাওলানা আকরম খাঁ কেবল কোনো ব্যক্তি নাম মাত্রে পর্যবসিত নন, পরন্তু তিনি স্বয়ং একটি প্রবহমান মহাবৃত্তান্ত,যাঁর ঔরসজাত কীর্তির ওপর এই মর্ত্যলোকে নানাবিধ নিবিড় জ্ঞানতাত্ত্বিক অভিসন্দর্ভ ও তত্ত্বানুসন্ধান সম্পাদিত হয়েছে। তিনি আমৃত্যু অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সপক্ষে নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। “কেউ সাথে না এলে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একাই পথ চলতে হইবে” এই মহিমান্বিত আপ্তবাক্য থেকেই অনুধাবন করা সম্ভব, মাওলানা মোহাম্মাদ আকরম খাঁর প্রকৃত স্বরূপ ও চিন্তাগত মহিমা কী ছিল। তিনি রাজপথ থেকে শুরু করে মসজিদ পর্যন্ত সর্বাঙ্গে স্বীয় অবস্থানের সমুজ্জ্বল জানান দিয়েছেন। তিনি কখনো আত্মপরিচয়ের গ্লানি কিংবা হীনম্মন্যতায় নিমজ্জিত হননি। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করে গেছেন; “আমাকে যদি কোনো আদর্শবাদে চিহ্নিত করতে চাও, তবে ওহাবী বলে আখ্যায়িত করো।” ওহাবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করা আরেক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সংবাদ ও রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব আবুল মনসুর আহমদ সহেব মাওলানা আকরম খা‘র পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে ব্যক্ত করেছেন; ‘মাওলানা আকরম খাঁ কেবল একটি ব্যক্তিসত্তা ছিলেন না, অন্যান্য বহু নেতার ন্যায় তিনি শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একটি বিশেষ যুগের প্রতিনিধি, যুগের প্রতীক।’

বর্তমান প্রজন্ম এই কালজয়ী জননেতাকে প্রায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে বিসর্জন দিতে চলেছে। ফলশ্রুতিতে মনস্থ করলাম, তাঁর উদ্দেশ্যে কিঞ্চিৎ লেখনী চালনা করি; তদ্দ্বারা যদি বর্তমান প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা সম্ভবপর হয়। পরন্তু আমি তো জ্ঞানতাত্ত্বিক দীনতায় ক্লিষ্ট। তাঁর ন্যায় এতাদৃশ মহান ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখনী ধারণ আমার পক্ষে ধৃষ্টতাস্বরূপ। কতিপয় দিবস পূর্বে রাজ্জাকী আহসান সহেবের বিদ্যাবত্তামূলক সন্দর্ভ অধ্যায়ন করছিলাম। তিনি “Some Aspects of Bengali Muslim Social and Political Thought, 1918–1947” শিরোনামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে স্বীয় পিএইচডি সন্দর্ভ সম্পন্ন করেছেন। উক্ত সন্দর্ভটি পর্যালোচনাকালে প্রত্যক্ষ করলাম, গবেষক মহোদয় প্রথম অধ্যায়েই মাওলানা আকরম খাঁ-কে নিয়ে দীর্ঘ ও সুবিস্তৃত সন্দর্ভ উপস্থাপন করেছেন। আলোচনাটি ছিল অত্যন্ত উচ্চমার্গীয় এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। তখন অনুধাবন করলাম, আকরম খাঁ সাহেবের অংশটি অনূদিত করাই শ্রেয়। এটাই হবে যথার্থ পদক্ষেপ; কেননা সুযোগ্য ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে সুযোগ্য মনীষীই লেখনী ধারণ করেছেন। উক্ত গবেষণাটি বহু কালপূর্বের হওয়ায় অনুবাদকের পক্ষ থেকে কতিপয় পাদটীকা সংযোজন করতে হয়েছে একান্ত বাধ্য হয়েই। যেসব পাদটীকা অনুবাদকের পক্ষ থেকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেগুলোর শেষে “(-অ)” লিখে দেয়া হয়েছে। প্রত্যাশা করি, সমগ্র প্রবন্ধটি পাঠ করলে পাঠকসমাজ মাওলানা মোহাম্মাদ আকরম খাঁ সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা লাভ করতে পারবেন। মাওলানা সাহেব কে কেন্দ্র করে অদ্যাবধি কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা-তৎপরতা সুসম্পন্ন হয়নি। আশা রাখি, বর্তমান প্রজন্ম এই সারস্বত কর্মে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, ইনশাআল্লাহ।—অনুবাদক

এক শতাব্দীব্যাপী ব্যতিক্রমী দীর্ঘ জীবন লাভকারী মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ রাজনীতি ও পেশাগত জীবনে বহুমুখী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮৬৮ সালের ৭ জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন।[1] ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের মাত্র এক দশক পর তাঁর জন্ম; ফলে তাঁর জীবন ও চিন্তাজগতের ওপর সেই বিদ্রোহ এবং পরবর্তী ওয়াহাবি বিচারসমূহ (১৮৬৩–১৮৭০)-এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের ছাপ পরিলক্ষিত হয়।[2] আকরম খাঁ’র পিতা মাওলানা আবদুল বারী ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন[3] এবং তিনি ইসলামের আহলেহাদীস ধারার একজন অনুসারী ছিলেন।[4] পিতার কাছ থেকেই আকরম খাঁ ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শ উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন।[5] পরবর্তীকালে আকরম খাঁ নিজেও আহলেহাদীস মতাদর্শ অনুসরণ করেন এবং ইসলামের মৌলিক বিশুদ্ধতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে বলে তিনি মনে করতেন,এমন সকল অনৈসলামিক রীতি-প্রথা পরিহার ও সংস্কারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন। তিনি মনে করতেন, হাদিস অর্থাৎ নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী ও কর্ম-অনুশীলন এবং কুরআন-এর নির্দেশনার ভিত্তিতে ইসলামের যে মৌলিক ও বিশুদ্ধ রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা অক্ষুণ্ণ রাখা আবশ্যক। তাঁর দৃষ্টিতে ইসলামী বিধিবিধানের ক্ষেত্রে শরিয়াহ অর্থাৎ ইসলামের বিধানব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাখ্যা বা মতাদর্শ গ্রহণযোগ্য ছিল না। আকরম খাঁ’র পূর্বপুরুষেরা পূর্ববঙ্গের যশোর–খুলনা অঞ্চল থেকে আগত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে হিন্দুধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন।[6]-[7] ধারণা করা হয়, এই পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি তাঁর মানসিক জগতে এমন একটি প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, যা তাঁকে বাংলার মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত বিভিন্ন দেশীয় উপাদান ও হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুশীলনের প্রতি তীব্র বিরোধিতার দিকে পরিচালিত করে। আকরম খাঁ তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কখনো কখনো অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করতেন। ইসলামকে হিন্দুধর্ম, সুফিবাদ, পীরবাদ এবং তাঁর দৃষ্টিতে অনৈসলামিক অন্যান্য প্রভাব ও প্রথা থেকে মুক্ত করাকে তিনি জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও রাজনীতিক বিভিন্ন ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করলেও ইসলামি আদর্শের সুরক্ষা এবং মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রশ্নে আকরম খাঁ তাঁর অবস্থানে ছিলেন আপসহীন ও অবিচল।

প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর মাওলানা আকরম খাঁ বর্ধমানের একটি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার একটি ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তাঁর অনাগ্রহ ছিল এবং একপর্যায়ে তিনি ওই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। এর পরিবর্তে তিনি আরবি ভাষা শিক্ষার প্রতি অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং ১৮৯৬ সালে কলকাতা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি ১৯০১ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। কলকাতা মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের কাছে মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে বাংলা ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন। এ দাবিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে পাঠ্যক্রমে বাংলা ভাষা অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি সুসংগঠিত উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে বাংলা ভাষা প্রবর্তন করে।[8]

কলকাতা মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত অবস্থাতেই আকরম খাঁ সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। সে সময় সাংবাদিকতার পরিধি মূলত বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনা এবং বিদেশি সংবাদপত্র ও সাময়িকী কিংবা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র ও জার্নাল থেকে সংবাদ অনুবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলার মুসলমানদের নিজস্ব কোনো দৈনিক সংবাদপত্র তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও সংবাদ প্রতিবেদন বা সংবাদ সংগ্রহের আধুনিক রীতির সঙ্গে তেমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি। আকরম খাঁ প্রথমে আহলেহাদীস-এর সঙ্গে কাজ করেন।[9] পরবর্তীকালে তিনি মোহাম্মদী আকবর-এ যোগ দেন।[10] সেখানে তাঁর অনূদিত উর্দু ও বাংলা প্রবন্ধ এবং বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। মোহাম্মদী আকবর-এ প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধগুলোতে খ্রিস্টধর্ম ও খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যক্রমের প্রতি বিরূপ মনোভাবের প্রকাশ দেখা যায়, যা তৎকালীন মুসলিম সমাজের মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মপ্রচারমূলক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাঁরা মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাংলার মুসলিম সমাজে খ্রিস্টানবিরোধী মনোভাবের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (১৮৬১–১৯০৭)-এর রচনাবলিতে।

মুসলমানদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনাও সে সময় বিদ্যমান ছিল।[11] ১৯০৩ সাল থেকে আকরম খাঁ মোহাম্মদী-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।[12] প্রায় ১৯০৮ সালের দিকে তিনি পত্রিকাটির স্বত্বাধিকার লাভ করেন এবং এরপর থেকে স্থায়ীভাবে সাময়িকপত্র সম্পাদনা ও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।[13] আকরম খাঁ ১৯১৫ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত মাসিক ধর্মীয় সাময়িকপত্র আল-ইসলাম-এরও সম্পাদনা করেন।[14] ১৯২০-এর দশকে তিনি জামানা[15] ও সেবক[16] নামে দুটি সাময়িকপত্র প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে ১৯৩৬ সালের অক্টোবর থেকে তিনি আজাদ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে এটিই ছিল একমাত্র বাংলা দৈনিক সংবাদপত্র, যা ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে বাংলায় মুসলিম লীগের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে সমর্থন করলেও তাঁর প্রধান উদ্বেগ ছিল বাংলার মুসলমানদের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণ করা। এই কারণেই তিনি ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।[17]

পরবর্তীকালে, ১৯১৪ সালে তিনি ময়মনসিংহের জামালপুর মহকুমার কামারিয়ার চরে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি কৃষকদের ওপর জমিদারদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন।[18] তবে এ অবস্থানের পেছনে তেমন কোনো সুস্পষ্ট আদর্শিক ভিত্তি ছিল না। বাংলার মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল কৃষক। ফলে বাংলার মুসলিম রাজনীতিকরা ধীরে ধীরে কৃষকদের বিভিন্ন অভিযোগ ও দুর্ভোগকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেন। তাঁদের ধারণা ছিল, কৃষকদের এসব সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরলে তাঁরা জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন এবং ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করতে সক্ষম হবেন।

১৯১৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত আকরম খাঁ খিলাফত আন্দোলন-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯২০ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত খিলাফত সম্মেলনে তিনি উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৫–১৯৫৮)[19], মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫–১৯৫০)[20] এবং মাওলানা মুজিবুর রহমান (১৮৭৩–১৯২৪) অংশগ্রহণ করেন।[21] খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় আকরম খাঁ তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি খিলাফত কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং তুরস্কের উসমানি খেলাফতের জন্য তহবিল সংগ্রহের দায়িত্ব লাভ করেন।[22] যদিও এসব উদ্যোগ বাস্তবিক অর্থে খুব বেশি কার্যকর বা বাস্তবসম্মত ছিল না, তথাপি খেলাফত ও প্যান-ইসলামিজমের[23] প্রতি তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস আকরম খাঁ-কে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের একজন উৎসাহী সমর্থকে পরিণত করে। তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বৃহৎ জনসমাবেশের আয়োজন করেন। মাওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত ”আল-ইসলাম ও মোহাম্মদী” উভয় পত্রিকাই ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।[24]

তিনি বাংলার আঞ্জুমান-ই-উলামা-এর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং সংগঠনটিকে খিলাফত আন্দোলনকে গতিশীল করার কাজে ব্যবহার করেন।[25] অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে “সেবক” পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় লেখার কারণে ১৯২২ সালে আকরম খাঁ গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় এক বছর কারাবন্দি থাকেন।[26] এই সময়েই, ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে চিত্তরঞ্জন দাস কলকাতায় স্বরাজ পার্টি গঠন করেন এবং আইন পরিষদে প্রবেশের নীতির প্রতি তাঁর সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। আকরম খাঁ তখন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন এবং এ প্রশ্নে তিনি চিত্তরঞ্জন দাসের অবস্থানকে সমর্থন করেন। পরবর্তীকালে তিনি ১৯২৩ সালে বঙ্গীয় চুক্তি (Bengal Pact) প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেন। এই চুক্তির অধীনে বাংলার মোট জনসংখ্যায় মুসলমানদের যে আনুপাতিক হার ছিল, সরকারি চাকরিতে সেই অনুপাতে মুসলমানদের নিয়োগের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়। চুক্তিতে আরও নির্ধারিত ছিল যে, মুসলমানরা সরকারি চাকরির মোট ৫৪ শতাংশে পৌঁছানো পর্যন্ত সরকারি দপ্তর এবং কলকাতা করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা ও স্থানীয় বোর্ডের মতো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে সৃষ্ট নতুন চাকরির ৮০ শতাংশ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।[27] ১৯২৪ সালে আকরম খাঁ সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি বঙ্গীয় চুক্তির পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর সুসংগঠিত ও প্রাঞ্জল ভাষণে তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের এ বিষয়ে তাঁর অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানাতে সক্ষম হন। ফলস্বরূপ, চুক্তিটি প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।[28]

১৯২৬–১৯২৭ সালে কলকাতা ও ঢাকায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আকরম খাঁ’র হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি আস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বঙ্গীয় চুক্তির অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও এর কার্যকরী শক্তি চিত্তরঞ্জন দাস ১৯২৫ সালের জুন মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এর পর আকরম খাঁ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর পূর্ববর্তী আশাবাদ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও তিনি তখনও কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। প্রায় ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরের দিকে নেহরু রিপোর্ট-কে কেন্দ্র করে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন। নেহরু রিপোর্টে পৃথক সাম্প্রদায়িক নির্বাচকমণ্ডলীর (separate communal electorates) ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল এবং ভারতের জন্য ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস (Dominion Status) দাবি করা হয়েছিল। তবে মুসলমানদের সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটিই শেষ পর্যন্ত আকরম খাঁ ও কংগ্রেসের মধ্যে বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।[29] ১৯২৯ সালে আকরম খাঁ স্যার আবদুর রহিম (১৮৬৭–১৯৫২)[30]-এর সঙ্গে যৌথভাবে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি (All-Bengal Tenants’ Association) গঠন করেন। আকরম খাঁ ছিলেন বাংলার মুসলিম নেতাদের উদ্যোগে গঠিত এই প্রথম অসাম্প্রদায়িক ও সম্পূর্ণ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সম্পাদক। দলটির সদস্যদের অধিকাংশই ছিলেন উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির, যাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ও ধনী কৃষকদের স্বার্থ বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা। তবে এর অন্তরালে বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের উদ্দেশ্যও কার্যকর ছিল। দলটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের হলেও এর সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিলেন মুসলমান। কংগ্রেসের যেসব সদস্য জমিদারবিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন, তাঁদের কেউ কেউ প্রজা সমিতিতে যোগ দেননি; বরং তাঁরা কৃষক সভা ও কিষান সভায় যোগ দেন। বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন একটি পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে মুসলিম নেতাদের একটি অংশ জমিদারদের পক্ষাবলম্বন করছিলেন।[31] কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আকরম খাঁ এমন একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেন, যার স্বার্থ কংগ্রেসের বহু নেতার অবস্থান ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তবে রাজনৈতিক পরিসরে কৃষকদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার অর্থ এই ছিল না যে আকরম খাঁ সমাজতান্ত্রিক বা সাম্যবাদী চিন্তাধারার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি সাম্যবাদের বিরোধী ছিলেন। তাঁর ধর্মীয় সংস্কারবাদী মানসিকতার পটভূমি বিবেচনা করলে তাঁর এই সাম্যবাদবিরোধী অবস্থান অনেকাংশেই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত বলে প্রতীয়মান হয়।

১৯২৯ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে এ. কে. ফজলুল হক (১৮৭৩–১৯৬২), আবদুল করিম (১৮৬১–১৯৪৩)[32], শামসুদ্দিন আহমেদ (১৮৮৯–১৯৬৯) এবং তমিজউদ্দীন খান (১৮৮৯–১৯৬৩)-এর সঙ্গে আকরম খাঁ’র রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা করে। তবে ১৯৩৪ সালের মধ্যে দলের সভাপতির পদ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে আকরম খাঁ ও উল্লিখিত নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত ফজলুল হক দলটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং শামসুদ্দিন আহমেদ আকরম খাঁ’র স্থলাভিষিক্ত হয়ে সাধারণ সম্পাদক হন। ফজলুল হক দলটির নাম পরিবর্তন করে কৃষক প্রজা পার্টি (Krishak Praja Party) রাখেন, যাতে কৃষকসমাজের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। দলটি তখন জমিদারি প্রথা বিলোপের দাবি উত্থাপন করে এবং “লাঙল যার,জমি তার” (Land to the tillers) ও সবার জন্য “ডাল-ভাত”[33]-এর মতো স্লোগান প্রচার করে। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো ছিল কৃষক প্রজা পার্টির অধিকতর র‍্যাডিক্যাল বা প্রগতিশীল অংশের স্লোগান। দলের নেতৃত্ব বাস্তবে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এগুলো গ্রহণ করেনি; তবে নির্বাচনের পূর্বে জনসমর্থন আকর্ষণের কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এসব স্লোগান ব্যবহারে তারা আপত্তি করেনি। এভাবেই বাংলার কৃষকসমাজ ধীরে ধীরে ফজলুল হকের নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত হতে থাকে। আকরম খাঁ পূর্বানুমান করেছিলেন যে, কৃষক প্রজা পার্টির এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে না। এর আগে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি-তে থাকাকালে তিনি দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ভূমি হস্তান্তরের ওপর জমিদারদের আরোপিত ফি বিলোপ, খাজনা হ্রাস, ঋণগ্রস্ত কৃষকদের স্বস্তি প্রদান এবং কৃষকদের কাছ থেকে অবৈধ আদায় বন্ধ করার মতো বিভিন্ন দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক আদর্শগত মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। এরই পরিণতিতে ১৯৩৬ সালের জুন মাসে আকরম খাঁ মুসলিম লীগে যোগ দেন।

মুসলিম লীগের প্রতি আকরম খাঁ’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে ”আজাদ” পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। পত্রিকাটি বাংলা ভাষায় দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং মুসলিম লীগের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে। ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের প্রাক্কালে আজাদ বাংলায় মুসলিম লীগের পক্ষে ব্যাপক জনআবেগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। পত্রিকাটি মূলত মুসলিম লীগ ও বাংলার মুসলমানদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার উদ্দেশ্যেই প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম সংখ্যাতেই পত্রিকাটি ঘোষণা করে যে, এর উদ্দেশ্য মুসলিম সমাজের সেবা করা। এতে বলা হয়, ”বাংলার মুসলমানদের চারপাশে পরিব্যাপ্ত সব ধরনের অনাচার ও সংকট থেকে তাদের মুক্ত করতে আজাদ ভূমিকা পালন করবে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে তাদের একজন “নির্ভীক পথপ্রদর্শক” হিসেবে কাজ করবে।”[34]

বাংলার মুসলিম সমাজের মধ্যে মুসলিম লীগের পক্ষে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক মতৈক্য গড়ে তুলতেও আজাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ সময় আকরম খাঁ বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। আজাদ-এর মাধ্যমে তিনি কলকাতা কেন্দ্রিক মুসলিম লীগ নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নেন এবং পূর্ববঙ্গের তুলনামূলকভাবে অধিক জনপ্রিয় নেতা ফজলুল হকের পরিবর্তে খাজা নাজিমুদ্দিনকে সমর্থন করেন। আকরম খাঁ’র মধ্যে ফজলুল হক ও কৃষক প্রজা পার্টি-বিরোধী মনোভাব ছিল প্রবল। ১৯৪১–১৯৪২ সালে আকরম খাঁ, খাজা নাজিমুদ্দিন, এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী ও তমিজউদ্দীন খান সম্মিলিতভাবে মুসলিম জনমতকে সংগঠিত করে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভার পতন ঘটানোর উদ্যোগ নেন।[35] আকরম খাঁ খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করেন, কারণ এতে কৃষক প্রজা পার্টি-র কোনো সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, আকরম খাঁ বরাবরই খাজা নাজিমুদ্দিনকে সমর্থন করে এসেছিলেন। যদিও তিনি প্রবলভাবে ব্রিটিশবিরোধী ছিলেন, তথাপি এমন কোনো অবস্থান গ্রহণের ব্যাপারে তিনি সতর্ক ছিলেন, যা একদিকে তাঁকে ব্রিটিশ সরকারের বিরাগভাজন করতে পারে অথবা অন্যদিকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নেতৃত্বের অভিপ্রায়ের সীমা অতিক্রম করতে পারে। আকরম খাঁ বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবি ন্যায়সংগত। ১৯৪৬ সালে “পাকিস্তান” নামে একটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আকরম খাঁ এ দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তাঁর রচিত “হাম লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” এবং “পাকিস্তাননামা” কবিতা ১৯৪৬ সালের দিকে রচিত হয়ে মুসলিম সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।[36] এ সময় আজাদ পত্রিকাও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রতি পূর্ণাঙ্গভাবে সমর্থন নিবেদন করে।[37] যদিও আকরম খাঁ নিজে একজন বাঙালি মুসলমান ছিলেন, তিনি বাঙালি মুসলমানদের পৃথক আঞ্চলিক ও ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে তিনি প্রথমত নিজেকে মুসলমান হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং ভারতের মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র সাম্প্রদায়িক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। পাকিস্তানের দাবির পেছনে তাঁর যে মৌলিক প্রেরণা কাজ করেছিল, তা ছিল ইসলামী মূল্যবোধ সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষা।[38] তবে তিনি বাংলাকে বিভক্ত হতে দেখতে চাইতেন না। ১৯৪৭ সালের মে–জুন মাসে আকরম খাঁ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠার যেকোনো উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেন; একই সঙ্গে তিনি বাংলাকে বিভক্ত করারও বিরোধিতা করেন। তাঁর অভিপ্রায় ছিল সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় তিনিই আবার বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।[39] ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হওয়ার পর আকরম খাঁ ঢাকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

আকরম খাঁ’র রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের প্রতি তাঁর আনুগত্যে যে পরিবর্তন ঘটেছিল, তা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি বৈপরীত্য ও অসংগতির দিক উন্মোচন করে। তাঁর সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি ধর্মীয় সংস্কারবাদের (আহলেহাদীস মতবাদের)[40] একজন দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। তবে রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি হিন্দুদের সঙ্গে সমঝোতা ও সহযোগিতার পথ অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন এবং ১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে বঙ্গীয় চুক্তি প্রণয়নে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। সে সময় তিনি বাংলার সেইসব মুসলিম নেতার অন্যতম ছিলেন, যাঁরা কংগ্রেসকে সমর্থন করতেন। এই সময় আকরম খাঁ ইসলাম ও মুসলিম সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি অমুসলিমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার লক্ষ্যে জমিয়ত-উলেমা-ই-হিন্দ[41]-এর নীতিমালা অনুসরণ করতেন। আকরম খাঁ কংগ্রেস, খিলাফত আন্দোলন, স্বরাজ এবং অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। দেওবন্দি অনুসারীদের মতো তিনিও ছিলেন প্রবল ব্রিটিশবিরোধী। আকরম খাঁ’র রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে দেওবন্দি নীতির এই অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য তাঁর মধ্যেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল; তিনি ছিলেন ধর্মীয়ভাবে আহলেহাদীস মতবাদের অনুসরী, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অসাম্প্রদায়িক। তবে ১৯২৬–১৯২৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর পূর্ববর্তী বিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং তাঁকে অনেকাংশে মোহমুক্ত করে। একই সময়ে উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিভিন্ন দাবি এবং হিন্দুদের সঙ্গে তাদের স্বার্থের ক্রমবর্ধমান সংঘাত হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তোলে। ১৯২৮ সালের মধ্যে আকরম খাঁ আরও দৃঢ়ভাবে এই ধারণায় উপনীত হন যে, মুসলিম সমাজের প্রতি কংগ্রেসের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ন্যায়সংগত ছিল না। তাঁর দৃষ্টিতে এর অন্যতম প্রমাণ ছিল নেহরু রিপোর্ট, যেখানে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন সাংবিধানিক সুরক্ষা,যেমন পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যবস্থা, আসন সংরক্ষণ এবং বাংলায় মুসলমানদের জন্য সরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট অংশের ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। ফলে রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্যায়ে যে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অবস্থান তিনি গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা ক্রমশ ভেদবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতির দিকে রূপান্তরিত হয়। তাঁর রাজনৈতিক বিবর্তনের এই পরিবর্তন মূলত ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের অবনতি এবং মুসলিম স্বার্থের সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে তাঁর ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের সঙ্গে অধিকতর সম্পর্কিত ছিল।

আলিগড়পন্থীদের বিপরীতে দেওবন্দিরা ছিলেন প্রবলভাবে ব্রিটিশবিরোধী এবং তাঁরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিরও বিরোধিতা করেছিলেন। মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ যে দ্বিজাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory)-এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন, দেওবন্দিরা তা সমর্থন করেননি। মুসলিম লীগের অধিকাংশ নেতাই ছিলেন ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, ধর্মীয় বিষয়ে সাধারণত সংস্কার পন্থী(তরীকা-ই-মোহাম্মাদী) ধারার ছিলেন না এবং রাজনৈতিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন। তাঁদের চিন্তাধারা আলিগড়ি ধারার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে অধিক ঘনিষ্ঠ ছিল। অন্যদিকে, মাওলানা আকরম খাঁ ইংরেজি শিক্ষাকে অপছন্দ করতেন না এবং তিঁনি কোনো পাশ্চাত্যধারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও গ্রহণ করেননি। ধর্মীয় ক্ষেত্রেই তিনি আধুনিকতাবাদবিরোধী ছিলেন। যদিও তিনি প্যান-ইসলামবাদী এবং জমিয়ত-উলেমা-ই-হিন্দ-এর নেতা ছিলেন, তথাপি ভারতের বিভাজনের প্রশ্নে তিনি হুসাইন আহমদ মাদানি (১৮৭৯–১৯৫৭) ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮–১৯৫৮)-এর মতো অন্যান্য প্যান-ইসলামবাদী ও দেওবন্দি নেতাদের থেকে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন। মাদানি ও আবুল কালাম আজাদ মনে করতেন, ভারত একটি ঐক্যবদ্ধ ও “অবিভাজ্য সত্তা”। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ভারতের মুসলমানদের লক্ষ্য হওয়া উচিত “তাঁদের ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক অধিকার সংরক্ষণের পাশাপাশি পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা।[42] তাঁদের মতে, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পার্থক্য মানুষের মাতৃভূমির সঙ্গে সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে না; যেমন ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, গায়ের রং কিংবা দৈহিক গঠন মানুষের অভিন্ন মানবিক পরিচয়কে পরিবর্তন করে না।[43] এই কারণেই তাঁরা দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, ভারত বিভক্ত হলে মুসলিম সমাজও তিনটি পৃথক অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং এর ফলে মুসলমানরা একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও দুর্বল সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। তবে দেওবন্দি উলামা ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের ধারণা গ্রহণে রাজি করাতে ব্যর্থ হন। এর অন্যতম কারণ ছিল মুসলিম সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আকাঙ্ক্ষা ততদিনে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ১৯৩০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে আকরম খাঁ মুসলিম লীগের দাবিগুলোর প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করেন এবং ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবিকে ন্যায়সংগত বলে মনে করেন। আকরম খাঁ’র এই পৃথক রাষ্ট্রের দাবির সমর্থনের পেছনে তাঁর একটি ভূখণ্ডাতিরিক্ত (extra-territorial) রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চেতনা কাজ করেছিল, যা খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর পূর্ববর্তী সম্পৃক্ততার সময় থেকেই তাঁর মধ্যে বিকশিত হয়েছিল। দেওবন্দিরা এবং জমিয়ত-উলেমা-ই-হিন্দ-ও খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু ১৯২৪ সালে খেলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর তারা ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত অধিক বাস্তববাদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে।[44] তারা মানবতাবাদ ও সহনশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং এমন সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখে যে মুসলমানরা একটি অমুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে।[45]

অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নেও আকরম খাঁ’র মতামত তাঁর সম্পাদিত মোহাম্মদী ও আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৩১ সালে মোহাম্মদী-তে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি বাংলায় পৃথক নির্বাচনের বিরোধিতা করে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন।[46] তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু বাংলায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেহেতু ভোটরগণ তাঁদের স্বার্থের জন্য অধিকতর উপযোগী। আকরম খাঁ’র মতে, বাংলায় পৃথক নির্বাচন শুধু “অপ্রয়োজনীয়” নয়, বরং “অত্যন্ত ক্ষতিকর”।[47] অথচ এর আগে ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি (Lucknow Pact)-তে পৃথক নির্বাচন ও মুসলমানদের জন্য বিশেষ প্রতিনিধিত্বের (weightage) যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, আকরম খাঁ তা সমর্থন করেছিলেন।[48] কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে এসে তাঁর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। তিনি লিখেছিলেন, বাংলার মুসলমানদের পক্ষে পৃথক নির্বাচন ও বিশেষ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা গ্রহণ করা একটি বুদ্ধিহীন সিদ্ধান্ত ছিল। এ সময়, প্রায় ১৯৩২ সালের দিকে, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগও যৌথ নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করেছিল। আকরম খাঁ তাঁদের অন্যতম ছিলেন, যাঁরা দাবি করেছিলেন যে বঙ্গীয় আইনসভা নির্বাচনের ভিত্তি হওয়া উচিত সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার (adult franchise)।[49] একই প্রবন্ধে আকরম খাঁ উল্লেখ করেন যে, পৃথক ও যৌথ নির্বাচনের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে দলাদলি ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।[50] তিনি আরও লিখেছিলেন যে, পৃথক নির্বাচনের প্রবর্তনের মাধ্যমে কংগ্রেসে যোগদানকারী মুসলিম রাজনীতিকদের পুনরায় মুসলিম রাজনীতির পরিসরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে,এমন একটি আশা করা হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন যে, সৈয়দ জালালউদ্দীন হাশেমী (১৮৯০–১৯৪৭) কিংবা সৈয়দ নওশের আলী (১৮৯০–১৯৭২)-এর মতো নেতাদের এ ধরনের সাংবিধানিক সুবিধার মাধ্যমে কখনোই প্রলুব্ধ করা সম্ভব নয়।[51] আকরম খাঁ বাংলার মুসলমানদের সতর্ক করে দেন যে, পৃথক নির্বাচন একটি সাময়িক ব্যবস্থা; অতএব মুসলমানদের এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া উচিত নয়। তাঁদের নিজেদের আত্মনির্ভরতার চেতনা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা কোনোভাবেই হারানো উচিত নয়।[52]

মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় মুসলমানদের সংগীত ও চিত্রকলার চর্চা এবং ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের ওপর “রিবা” (সুদ) গ্রহণের বিষয়েও আকরম খাঁ’র মতামত প্রকাশিত হয়েছিল।[53] এসব বিষয়ে তাঁর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ইসলামের মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আধুনিকতার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছিলেন। মুসলিম সমাজে চারুকলা ও নান্দনিক শিল্পচর্চার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত ছিল। কিন্তু আকরম খাঁ এ ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক সংকোচ কিছুটা দূর করার চেষ্টা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, কুরআন কিংবা ইসলামী শরিয়া হতে সংগীত ও চিত্রকলার চর্চা সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি।[54] তবে সুফি ও মরমি সাধকদের মধ্যে প্রচলিত সংগীতচর্চার অতিরিক্ততার বিষয়ে তিনি আপত্তি প্রকাশ করেন।[55]

বাঙালিদের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার ব্যবহারের প্রশ্নে আকরম খাঁ বরাবরই এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কলকাতা মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত অবস্থায়ই তিনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে এর পাঠ্যক্রমে বাংলা ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাজি করিয়েছিলেন।[56] ১৯১৮ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি (Bangiya Musalman Sahitya Samity)-এর তৃতীয় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেন;

“পৃথিবীতে অনেক অদ্ভুত প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত প্রশ্ন হলো ‘বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা কী হবে? উর্দু, নাকি বাংলা?’ ... বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনালগ্ন থেকেই বাংলা ভাষা লিখিত ও কথ্য উভয় ক্ষেত্রেই মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।”[57]

আজাদ পত্রিকাটি বাংলায় প্রকাশিত হতো এবং বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তাদের বিভিন্ন দাবি ও আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরত। ভারতবর্ষে সর্বাধিক সংখ্যক মুসলমানের বসবাস ছিল বাংলাকেন্দ্রিক অঞ্চলে। বাংলা ও আসামের প্রায় তিন কোটি মুসলমানের সামনে সে সময় বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবি বিদ্যমান ছিল। আকরম খাঁ মনে করতেন, সমাজে যখন ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলমান, তখন বাংলার মুসলমানদের নিজেদের মতামত, দাবি ও অভিযোগ প্রকাশ করার জন্য একটি কার্যকর মাধ্যম প্রয়োজন।[58] এই রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই আজাদ পত্রিকা ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ (Communal Award)-এর বিরোধিতা করে, কৃষক প্রজা পার্টি ও ফজলুল হকের মন্ত্রিসভার (১৯৩৭–১৯৪৩) বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে এবং একই সঙ্গে ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার ধারণাকে জোরালোভাবে প্রচার ও সমর্থন করে। সামাজিক চিন্তার ক্ষেত্রে আকরম খাঁ বাংলার মুসলিম সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত অনৈসলামিক আচার-অনুশীলনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ মুসলিম বাংলার সামাজিক ইতিহাস-এ তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক চিন্তাধারার একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।[59] ওয়াহাবি, ফরায়েজি এবং তরীকাহ-ই-মুহাম্মদিয়া আন্দোলনের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি ছিলেন একজন ধর্মীয় সংস্কারবাদী এবং ভারতের মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন।[60] ভারতে, বিশেষত বাংলায়, ইসলাম কখনোই সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ বা অবিকৃত রূপে বিকশিত হয়নি এমনটাই আকরম খাঁ’র দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতীয়মান হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে বাংলায় ইসলামী রীতি-নীতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে হিন্দু ধর্মীয় আচার-প্রথার বিভিন্ন উপাদান মিশে যেতে থাকে। একইভাবে সুফি ও হিন্দু মরমিবাদের প্রভাবও ইসলামী ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়। বাংলায় ইসলাম গ্রহণকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মান্তরের প্রক্রিয়ার কারণেই এই সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ বিশেষভাবে বিস্তার লাভ করে। ইসলাম গ্রহণের পরও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনেকেই তাদের পূর্ববর্তী সামাজিক রীতি, প্রথা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অব্যাহত রাখে। এর ফলস্বরূপ বাংলায় এক ধরনের লোকায়ত বা দেশজ ইসলামি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল এসব দেশজ আচার-অনুশীলন থেকে ইসলামকে এমন সব উপাদান থেকে মুক্ত করা, যেগুলোকে সংস্কারবাদীরা শিরক (shirk) হিসেবে বিবেচনা করতেন।

আকরম খাঁ’র মতে, ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে বাংলা ইসলামের সংস্পর্শে আসে।[61] তিনি ১২০১ থেকে ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। প্রথম পর্যায় ১২০২ থেকে ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দ, দ্বিতীয় পর্যায় ১৩৪০ থেকে ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ এবং তৃতীয় পর্যায় ১৫৭৬ থেকে ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর মন্তব্য ছিল, প্রথম পর্যায় ছাড়া পরবর্তী দুটি পর্যায় বাংলায় মুসলমানদের অধঃপতনে ভূমিকা রেখেছিল।[62] আকরম খাঁ’র মতে, এই সময়কালে বাংলার মুসলিম সমাজ অভ্যন্তরীণভাবেই এক গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। তখন কুরআনের একটি অনুবাদও ছিল না এবং মুসলমানদের পথনির্দেশ ও অনুপ্রেরণা দেওয়ার মতো ইসলামী বিশ্বের কোনো সম্রাটও ছিলেন না। উপরন্তু, একদিকে তুর্কি, তাতার, আফগান ও ইরানিদের এবং অন্যদিকে বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রভাব বাংলার মুসলমানদের জন্য নিজস্ব ভাষা নির্বাচনের প্রশ্নটিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।[63] পরবর্তী সময়ে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ভাষাগত পরিচয়ের একটি সংকট সৃষ্টি হয়। বাংলায় ফারসি ভাষার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং মাওলানা আকরম খাঁ’র মতে, এর ফলে বাংলার মুসলিম সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।[64] ফারসি ভাষার ব্যাপক প্রসার মুসলমানদের বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মুসলিম বিশ্বের এমন কোনো শাসক ছিলেন না, যিনি আদর্শগত কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে প্রকৃত অর্থে একজন মুসলমান ছিলেন। একই সময়ে হিন্দুরা যখন তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ প্রত্যক্ষ করছিল, তখন বাংলার মুসলমানদের মধ্যে অনুরূপ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পৃষ্ঠপোষকতা বা উদ্যোগ গ্রহণকারী কোনো মুসলিম শাসক ছিলেন না। ফলে এ অঞ্চলের মুসলমানরা হিন্দু ও বৌদ্ধদের বিভিন্ন অনৈসলামিক প্রভাবের মধ্যে অবস্থান করছিল। মুসলমানরা বিভিন্ন পূজা অর্থাৎ হিন্দু দেবদেবী ও সাধু-সন্তদের উপাসনা এবং অন্যান্য পৌত্তলিক ও পৌরাণিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করত। এ সময়ের অধিকাংশ সাহিত্যেই হিন্দু ও সুফি মরমিবাদের প্রভাব পরিলক্ষিত হতো।[65]-[66] মাওলানা আকরম খাঁ পুঁথি[67] সাহিত্যের নেতিবাচক প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এসব পুঁথিতে হিন্দু দেবদেবীদের মুসলিম সাধু-সন্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, যা বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল।[68]

১৪৯৪ থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত বাংলার শাসক হুসেন শাহের চৈতন্যবাদ (Chaitanya-ism)-এর প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থানের জন্য মাওলানা আকরম খাঁ তাঁর সমালোচনা করেছেন।[69] তাঁর মতে, হুসেন শাহের শাসনামলেই বাংলায় পীর-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।[70] মাওলানা আকরম খাঁ সত্যপীর-এর উপাসনার প্রচলনের জন্যও হুসেন শাহ-কে দায়ী করেছেন।[71] সত্যপীর এবং অন্যান্য হিন্দু ও মুসলিম সাধু-সন্তকে কেন্দ্র করে এ সময় অসংখ্য কবিতা ও পুঁথি রচিত হয়। মধ্যযুগীয় বাংলা একই সঙ্গে সুফিবাদ ও চৈতন্যবাদের প্রভাবাধীন ছিল। মাওলানা আকরম খাঁ’র অভিমত ছিল, শ্রীচৈতন্য সমকালীন মুসলিম সমাজের প্রতি প্রকৃতপক্ষে বিরূপ ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি এমন একটি পদ উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে শ্রীচৈতন্য মুসলমানদের বোঝাতে “যবন” শব্দটি ব্যবহার করেছেন যা হিন্দুদের ব্যবহারে মুসলমানদের জন্য একটি অবমাননাকর অভিধা হিসেবে বিবেচিত হতো।[72] মাওলানা আকরম খাঁ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বাংলাকে ইসলামী প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে হুসেন শাহ একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।[73] এর পরিণতিতে তিনি মনে করেন, এ সময়েই সংস্কারপন্থী মুসলমানদের মধ্যে এসব অনৈসলামিক প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনের সূচনা ঘটে।[74] “মুসলিম বাংলার চরম বিপর্যয়কাল” গ্রন্থে মাওলানা আকরম খাঁ ভারতের মুসলমানদের অতীত গৌরবের ইতিহাস পুনরালোচনা করতে গিয়ে তাঁদের অধঃপতনের ধারাবাহিকতাও তুলে ধরেছেন।[75] তাঁর মতে, তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (৬৪৪–৬৫৫ খ্রি.)-এর হত্যাকাণ্ড মুসলিম সমাজের অবক্ষয়ের প্রক্রিয়ার একটি প্রতীকী সূচনাবিন্দু। পরবর্তীকালে ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সেই অবক্ষয়ের ধারাকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অধঃপতন ভারতে মুঘল সম্রাট আকবরের (১৫৫৬–১৬০৫) শাসনামলে চরম পর্যায়ে উপনীত হয়।[76]

মাওলানা আকরম খাঁ’র বিশ্বাস ছিল, আকবর ভারতে মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন অনৈসলামিক আচার-অনুশীলনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করেছিলেন।[77] তিনি এ বিষয়ে অবগত ছিলেন যে, ভারতের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াসে আকবর তাঁর ধর্মীয় সমন্বয়বাদী নীতির জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। তবে মাওলানা আকরম খাঁ’র মতে, এই প্রশংসা মূলত অমুসলিম ইতিহাসবিদদের কাছ থেকেই এসেছে। তিনি আকবরের প্রশংসাকারী এসব ঐতিহাসিক ও গবেষকের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত ছিলেন না।[78] মাওলানা আকরম খাঁ ১৫৮২ সালে আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত দীন-ই-ইলাহী এবং এর অন্তর্নিহিত ধর্মীয় সমন্বয়বাদের নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর দৃষ্টিতে, আকবর ভারতে মুসলিম সমাজের মধ্যে একটি বিপজ্জনক “পাপ”-এর সূচনা করেছিলেন, যা মুসলমানদের অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।[79] আকবরের দীন-ই-ইলাহী-তে হিন্দুধর্ম ও ইসলামের বিভিন্ন উপাদানকে সমন্বয়বাদী পদ্ধতিতে একীভূত করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। আকবর ভারতের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সমর্থন ও আনুকূল্য অর্জন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মাওলানা আকরম খাঁ এটিকে ইসলামের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করেন। মাওলানা আকরম খাঁ’র মতে, ভারতে ইসলামের ভিত্তি দুর্বল ও ধ্বংস করার লক্ষ্যেই আকবর তাঁর ধর্মীয় নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। একই কারণে তিনি দারাশিকোহ (১৬১৫–১৬৫৯)-এরও কঠোর সমালোচনা করেন। দারাশিকোহও ধর্মীয় সমন্বয়বাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং প্রায় ১৬৫৬–১৬৫৭ সালের দিকে উপনিষদ-এর ফারসি অনুবাদ করেছিলেন। মাওলানা আকরম খাঁ’র দৃষ্টিতে, দারাশিকোহের এই ধরনের ধর্মীয় সমন্বয়বাদী প্রবণতাও ইসলামের জন্য একটি হুমকি ছিল।[80]

মাওলানা আকরম খাঁ ছিলেন ইসলামের মূল ব্যাখ্যার একজন দৃঢ় অনুসারী। তিনি শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শে বিশ্বাস করতেন। এ কারণে তিনি আওরঙ্গজেব (১৬১৮–১৭০৭)-এর প্রশংসা করেন। আওরঙ্গজেব ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও প্রচলিত ইসলামী মতাদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং আকবর ও দারাশিকোহের ধর্মীয় সমন্বয়বাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। দারাশিকোহের ভিন্নধর্মী ধর্মীয় মতাদর্শের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিতেও আওরঙ্গজেব দ্বিধা করেননি। ষোড়শ শতাব্দী থেকে বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ও ধর্মীয় চিন্তাজগতে আকবর ও আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকার দুটি স্থায়ী ও পরস্পরবিরোধী প্রবণতা হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। উভয় ধারাই ভারতীয় ইসলামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। মাওলানা আকরম খাঁ তাঁর সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসে মৌলবাদী এবং ধর্মীয় সমন্বয়বাদের বিরোধী হওয়ায় মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি ভারত বিভাজনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতার বিকাশ মূলত ধর্মীয় সমন্বয়বাদের বিরোধী মৌলবাদী মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। অবশ্য সব মৌলবাদী মুসলমানই বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না; তবে অমুসলিম ধর্মীয় সংস্কৃতি ও আচার-অনুশীলনের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাঁরা সাধারণত বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতেন। মাওলানা আকরম খাঁ তাঁর জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি জোর দিয়ে বলতেন যে, ভারতের মুসলমানদের নিজেদের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তা বজায় রাখা উচিত। মাওলানা আকরম খাঁ তাঁর সময়ের একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সমর্থনের কারণে তাঁকে সাম্প্রদায়িকতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক চিন্তায় বিদ্যমান বিভিন্ন অসংগতি তাঁকে সমালোচনার মুখে ফেলে একদিকে উলামা, অন্যদিকে আধুনিকতাবাদী এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার অনুসারী উভয় পক্ষ থেকেই তিনি সমালোচিত হন।

 

 


[1] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, মাওলানা আকরম খাঁ (জীবনী গ্রন্থমালা: সাহিত্যিক জীবনীগ্রন্থের একটি ধারাবাহিক প্রকাশনা), বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ৯।

[2] ‘বিদ্রোহ’ (Mutiny) শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ভারতের কিছু জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ এই ঘটনাকে ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ (War of Independence) হিসেবেও অভিহিত করেছেন।

[3] গবেষক সাহেবের এই তথ্য ঠিক নয়। আমীর সৈয়দ আহমাদ ব্রেলভীর সাথে শিখদের ১৮৩১ সালে বালাকটের যুদ্ধের সাথে কথিত সিপাহীবিদ্রোহের ঘটনা গুলিয়ে ফেলেছেন। ১৮৩১ সালে বালাকোট যুদ্ধে তাঁর পূর্বপুরুষদের একজন শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল বারী খাঁ সৈয়দ আহমাদ শহীদের মুজাহিদ আন্দোলনে শরিক হন। তিঁনি গাজী হাওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ছিল মাওলানা আকরম খাঁ'র পার্শ্ববর্তী গ্রামে।

আকরম খাঁ'র পিতা মাওলানা আবদুল বারী খাঁ আহলে হাদিস জামাতভুক্ত বিজ্ঞ আলিম, মুহাদ্দিস ও সুবক্তা ছিলেন। তিনি দিল্লীর স্বনামধন্য মুহাদ্দিস শাইখুল কুল ফিল কুল মিঞা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ নজীর হোসেন দেহলভী (রহ.)-এর নিকট প্রায় ছয় বছর হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করে এই শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর হস্তাক্ষর খুবই সুন্দর ছিল। তিনি "খোশখৎ" নামে একখানা পুস্তকও রচনা করেন। তিনি স্বহস্তে অত্যন্ত চমৎকারভাবে মহাকবি ফেরদৌসির ফার্সি ভাষায় রচিত বিখ্যাত 'শাহনামা' কাব্য গ্রন্থখানা নকল করে অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছেন। তাঁর 'খোশখৎ' গ্রন্থটি বর্তমানে কোলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া মাওলানা আবদুল বারী খাঁ আরবি ও ফার্সি সাহিত্যেও ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ছিলেন। তাঁর আরবি ও ফার্সি ভাষায় বেশ কয়েকখানা গ্রন্থ ছিল। এগুলো বর্তমানে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া, তাঁর বীরত্বপূর্ণ কীর্তিসমূহ বাংলাদেশ হতে আরম্ভ করে সুদূর বালাকোট প্রান্ত পর্যন্ত স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। সৈয়দ আহমদ শহীদের সাথে জিহাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কাফেলার তত্ত্বাবধান এবং মুজাহিদীনের ভর্তি সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত ছিল। তিনি সফল রণকৌশলীর ভূমিকা পালন করে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ জন্য বাংলার আজাদী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাওলানা আব্দুল বারী খাঁ  সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর খলিফা ছিলেন। আতিক সাহেব ও আবু জাফরের গ্রন্থে আব্দুল বারীর পিতা তোরাব আলী সাহেবকে তিতুমীরের শিষ্য হিসেবে দেখান হয়েছে। তথ্যটি ভুল। কারণ, আকরম খাঁ'র পিতা আব্দুল বারী ও তিতুমীর উভয়েই ছিলেন সৈয়দ আহমদের শিষ্য। তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী বাঙ্গের খলিফাগণের প্রতি নিম্নরূপ নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন:

"আমি পাটনায় পৌঁছে মাওলানা আব্দুল বারী খাঁ (মাওলানা আকরম খাঁ'র পিতা) মাওলানা মুহাম্মদ হোসেন, মাওলানা হাজী শরী'য়তুল্লাহ, মাওলানা সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর, সুফী খোদাদাদ সিদ্দিকী, মাওলানা কারামত আলীকে খবর দিব। আমার কোলকাতা পৌঁছার দিন-তারিখ তোমরা তাদের কাছে জানতে পারবে।" ( পিএইচডি থিসিস; "বাঙালি মুসলিম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে মাওলানা মোহাম্মাদ আকরম খাঁ'র অবদান"; গবেষক: ড. আবুল কালাম মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ; পৃষ্ঠা: ৪-৬)-অ

[4] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৯।

[5] , পৃ. ১০।

[6] , পৃ. ১০।

[7] এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গবেষক সাহেবের এই ধরনের সরল মন্তব্য কোন ভাবেই কাম্য নয়। গবেষক সাহেব মাওলানা মোহাম্মাদ আকরম খাঁ সাহেবের বংশ পরিচয় সম্পর্কে যেই তথ্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ ভুল। মাওলানা আকরম খাঁ'র পূর্বপুরুষদের নিয়ে বিভিন্ন লেখক ভিন্নমত পোষণ করেছেন। কেউ কেউ বলেন, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসীরা তাঁর পূর্বপুরুষ। কারও মতে, আকরম খাঁ'র পূর্বপুরুষগণ হিন্দু ছিলেন। এই বংশ পিরালী ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। খ্রিষ্টিয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে তাঁরা বাগেরহাটের শাসনকর্তা খান জাহান আলির সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাওলানা আকরম খাঁ এই পীরালী বংশের কৃতী সন্তান বলে লেখক আবদুল জলিল তাঁর সুন্দর বনের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ফার্সি বিভাগের গবেষক তাঁর পিএইচ.ডি. অভিসন্দর্ভে উল্লেখ করেছেন:

Here the blood-connection of Rabindranath Tagore with Maulana Muhammad Akram Khan has been historically established.

আকরম খাঁ'র বংশ সম্পর্কে উপরোক্ত বক্তব্যের যথার্থতা সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। স্বয়ং আবদুল জলীল তাঁর গ্রন্থেই এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন:

"আমি মাওলানা সাহেবের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করিয়াছি। তাঁহার বংশ পীরালী তাহা তিনি স্বীকার করেন না। তিনি বলেন যে, গৌড়ের সুলতান যদু বা জালালউদ্দীনের সময় হইতে তাঁহারা মুসলমান এবং জনৈক আলি খানের বংশধর।"

ঐতিহাসিক দৃষ্টিতেও বিষয়টি সমর্থনযোগ্য নয়। ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস্ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: তৎকালীন সমস্ত রায় চৌধুরীগণ পরবর্তী সময়ে খান চৌধুরীতে পরিণত হয়। কিন্তু আকরম খাঁ'র বংশ রায় বা খান চৌধুরী নয়। শুধু খাঁ উপাধিধারী। পীরালী সম্প্রদায়ের সাথে আকরম খাঁ'র বংশের কোনো সম্পর্ক যুক্তিসংগত নয়। কারণ, পীরালীদের সম্পর্ক হচ্ছে রায় চৌধুরীদের সাথে, খাঁদের সাথে নয়। এ সম্পর্কে আমি (গবেষক) আকরম খাঁ'র পুত্র বদরুল আনাম খাঁ ও কামরুল আনাম খাঁ'র সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। তাঁরা উপরোক্ত বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। স্বয়ং আকরম খাঁ'র জীবদ্দশায় এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি অস্বীকার করে বলেছিলেন:

"গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দীনের আমল থেকে তাঁরা মুসলমান এবং জনৈক আলি খানের বংশধর। তিনি তাঁকে পাঠান বংশোদ্ভূত বলে দাবী করেন।

আকরম খাঁ'র মাতা-পিতা একই বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর এক নানা সউদী আরবের বলে জানা যায়। সউদী আরবের সাথে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছাড়াও মাওলানার পারিবারিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ছিল।

পুরাতন রেকর্ডপত্র এবং মাওলানা সাহেবের মৌখিক সূত্রে জানা যায় যে, তাঁর এক মামাতো ভাই সউদী আরবে বাদশাহ আবদুল আযীয বিন স'উদের মন্ত্রীসভার যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা তৎকালীন হিজাযে গিয়ে স্থায়িভাবে বসতি স্থাপন করেছিলেন। অর্থাৎ, মাওলানা আকরম খাঁ'র এক নানা সউদী আরবের অধিবাসী ছিলেন। মাওলানা সাহেবের উক্ত মামাত ভাইয়ের নাম ছিল আকীল বা রাহীম। এ সম্পর্কে মরহুম মাওলানা বখশ নদভী সাহেবের সংক্ষিপ্ত জীবনকথা: নিজ জবানে জনাব মুহম্মদ আবদুর রহমান বিএবিটি সম্পাদিত সাপ্তাহিক আরাফাত পত্রিকায় প্রকাশিত অংশবিশেষ নিম্নরূপ:

"মাওলানা আকরম খাঁ সউদী আরব সরকারের যানবাহন মন্ত্রী শাইখ আকীল বা রহীমের নিকট একখানা চিঠি দেন। মন্ত্রী ছিলেন মাওলানা আকরম খাঁ'র মামাতো ভাই। তাঁহার পিতা কিংবা পিতামহ হিজরত করিয়া মক্কায় যান। তাঁহার মাতা ছিলেন আরবিয়, সুতরাং মামাও আরবিয়। আর মাতুলালয়েই তিনি প্রতিপালিত হন। বাংলা বা উর্দু কোনোটাই তিনি জানিতেন না। উক্ত পত্রে তিনি লেখেন যে, পত্রবাহক মাওলানা বখশ এবং খায়রুল আনাম তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র এক এবং অভিন্ন। আশা করি তাহাকে সেই দৃষ্টিতে দেখিবেন। বলা বাহুল্য, তিনি এই পত্র পেয়ে আমাকে খুবই স্নেহের দৃষ্টিতে দেখিতেন। মাঝে মাঝেই তিনি আমাকে তাঁহার বাসায় দাওয়াত করিতেন এবং নিজের মটরে নিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেন।"

উল্লেখ্য যে, মরহুম মাওলানা মাওলা বখশ নদভী বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলিম ও আরবি সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি কিছুকাল পবিত্র মক্কায়ও লেখাপড়া করেন। উপর্যুক্ত বিবরণীর দ্বারা আকরম খাঁর বংশের সাথে কবি রবীন্দ্রনাথের বংশের মিল তথ্যটি সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় না। ( পিএইচডি থিসিস; "বাঙালি মুসলিম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে মাওলানা মোহাম্মাদ আকরম খাঁ'র অবদান"; গবেষক: ড. আবুল কালাম মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ; পৃষ্ঠা: ৬-৮)-অ

 

[8] প্রাগুক্ত, পৃ. ১১-১২।

[9] আহলেহাদীস পত্রিকাটির প্রকাশকাল নিয়ে তারিখগত একটি অস্পষ্টতা রয়েছে। মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাঁর মাওলানা আকরম খাঁ  শীর্ষক জীবনী রচনায় উল্লেখ করেছেন যে, মাওলানা আকরম খাঁ’র সাংবাদিক জীবনের এই পর্যায়ে আহলেহাদীস একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতো; তবে তিনি এর সুনির্দিষ্ট প্রকাশকাল উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে, মোস্তফা নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, আহলেহাদীস প্রথমদিকে মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীকালে তা সাপ্তাহিকে রূপান্তরিত হয়। তাঁর মতে, পত্রিকাটির প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দেখুন: M. N. Islam, Shamayik Patre Jiban O Janamat, 1901–1930 (Public Opinion as Reflected in the Press, 1901–1930), বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৭৭, পৃ. ৪৩৫।

[10] মোহাম্মদী আকবর ছিল উর্দু ও বাংলা—দ্বিভাষিক একটি সাময়িকপত্র, যা প্রথমে দ্বিসাপ্তাহিক এবং পরবর্তীকালে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রথম ১৮৭৭ সালের জুন মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। মোস্তফা নূরুল ইসলাম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৪২৭। মোস্তফা নূরুল ইসলামের মতে, পত্রিকাটির প্রকাশনা দুই বছর অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাঁর মাওলানা আকরম খাঁ জীবনীগ্রন্থের ১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, কলকাতা মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে মাওলানা আকরম খাঁ মোহাম্মদী আকবর-এ লিখতেন। তিনি ১৮৯৬ সালে কলকাতা মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ১৯০১ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যয়ন করেন। ফলে পত্রিকাটির প্রকাশকাল এবং মাওলানা আকরম খাঁ’র এতে লেখালেখির সময়কাল সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও কালানুক্রমিক সামঞ্জস্য নিয়ে একটি অস্পষ্টতা থেকে যায়।

[11] আনিসুজ্জামান, Muslim Manas O Bangla Sahitya, 1757–1918 (বাংলার মুসলিম সাহিত্যিকদের একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ, ১৭৫৭–১৯১৮), ঢাকা, ১৯৮৩, ৩য় সংস্করণ, পৃ. ৩০৩, ৩০৯–৩১১।

[12] মোহাম্মদী ১৯০৩ সালে মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়; ১৯০৮ সালে এটি সাপ্তাহিক এবং ১৯২৭ সালে পুনরায় মাসিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। পত্রিকাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো এবং ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করাই ছিল এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মোস্তফা নূরুল ইসলাম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৪৪৭–৪৪৮।

[13] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ১৪–১৫।

 

[14]  , পৃ. ১৮।

[15] জামানা ছিল একটি উর্দু সাপ্তাহিক সাময়িকপত্র। এটি প্রথম ১৯২০ সালের মে মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় এবং ১৯২৪ সাল পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। পত্রিকাটি খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। , পৃ. ১৮–১৯।

[16] সেবক ছিল একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্র, যা ১৯২১ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি অসহযোগ আন্দোলন ও স্বদেশি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। পরবর্তীকালে সেবক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সরকারের বিরুদ্ধে একটি সম্পাদকীয় লেখার কারণে মাওলানা আকরম খাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

[17] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।

[18] আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর (Fifty Years of Politics As I Saw It), ঢাকা, ১৯৭৫, ৩য় সংস্করণ, পৃ. ২৩-২৪।

[19] মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (প্রকৃত নাম আবুল কালাম গোলাম মহিউদ্দিন) ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা, বিশিষ্ট ইসলামি ধর্মতত্ত্ববিদ, প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। তবে একটি তথ্য সংশোধন করা প্রয়োজন—তাঁর জন্ম সালটি ১৮৮৫ নয়, তিনি ১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। অসাম্প্রদায়িক ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অন্যতম এই অগ্রদূত। ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি নির্বাচিত হন।-অ

[20] মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫–১৯৫০) ছিলেন অবিভক্ত বাংলার একজন খ্যাতনামা ইসলামি চিন্তাবিদ, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী নেতা, সমাজ সংস্কারক এবং বাঙালি মুসলিম সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ।তিনি ১৮৭৫ সালের ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার আড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ধর্ম, ইতিহাস ও সমাজ সংস্কার নিয়ে প্রায় ৪২টি গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  1. ভারতে মুসলিম সভ্যতা
  2. ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান (৩ খণ্ড)
  3. ইসলাম জগতের অভ্যুত্থান
  4. ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান
  5. সমাজ সংস্কার

[21] ওই, পৃ. ৩৩-৩৪।

[22] তিনি 'সেন্ট্রাল খিলাফত কমিটি'র (Central Khilafat Committee) অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং খিলাফত কমিটির সম্পাদক (Secretary) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।-অ

[23] প্যান-ইসলামিজম (Pan-Islamism) বা সর্ব-ইসলামবাদ হলো একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মতাদর্শ, যার মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের সমস্ত মুসলিমকে একটি একক ইসলামিক রাষ্ট্র বা খিলাফত অথবা একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোটের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা। এই মতাদর্শের মূল ভিত্তি হলো—জাতীয়তা, ভাষা বা ভৌগোলিক সীমানা নির্বিশেষে বিশ্বের সকল মুসলিম একই উম্মাহর (ধর্মীয় সমাজ) অংশ।-অ

[24] শিলা সেন, মুসলিম পলিটিক্স ইন বেঙ্গল, নয়া দিল্লি, ১৯৭৬, পৃ. ৫০।

[25] প্রাগুক্ত। পৃ. ৪৯। আরও দেখুন জীবনী, পৃ. ১৭-১৮। ১৯১৩ সালে গঠিত আঞ্জুমান-ই-উলামা ছিল বাংলার উলামাদের একটি ধর্মীয় সংগঠন।

[26] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, প্রাগুক্ত পৃ. ১৯। প্রাগুক্ত এম. হায়দার পরিশিষ্ট ১, দ্য মর্নিং নিউজ, ১৫ জুন, ১৯৬৯।

[27] আবুল মনসুর আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ.৫১।

[28] ঐ, পৃ.৫৭।

[29]  অমলেন্দু দে, পৃ.৬২। উল্লেখ করা হয়েছে যে মুসলিম নেতারা ১৯২৮ সালের দিকে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসেন। দেখুন, বজলুর রহমান খান, পলিটিক্স ইন বেঙ্গল, ১৯২৭-১৯৩৬, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ.৩৭। কিন্তু ১৫ জুন, ১৯৬৯-এর দ্য মর্নিং নিউজ-এ মোহাম্মদ আকরাম খানের জীবন-চিত্র বলছে যে আকরাম খান ১৯২৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। দেখুন মহিউদ্দিন হায়দার, "এ সোসিওলজিক্যাল স্টাডি অন মাওলানা আকরাম খান" (অপ্রকাশিত এম.এ. থিসিস, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ১৯৬৮-৬৯, পরিশিষ্ট ১।

[30] স্যার আবদুর রহিম কেসিএসআই (১৮৭–১৯৫২) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, প্রভাবশালী বিচারক, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা। তিনি ১৮৬৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবাংলার মেদিনীপুরের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫২ সালের ১৯ অক্টোবর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯০৮ সালে তিনি মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন এবং দুই মেয়াদে অত্যন্ত সুনামের সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। বিচারক হিসেবে তাঁর নিরপেক্ষতা ও আইনি ব্যাখ্যা সমাদৃত ছিল তিনি ইসলামি আইনশাস্ত্রের ওপর ব্যাপক গবেষণা করেন. তাঁর রচিত আকর গ্রন্থ 'দ্য প্রিন্সিপলস অব মুহাম্মডান জুরিসপ্রুডেন্স' (The Principles of Muhammadan Jurisprudence) আজও মুসলিম আইনের একটি নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ।-অ

[31] আবুল মনসুর আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৩, ৬৬।

[32] মৌলভী আবদুল করিম (১৮৬৩–১৯৪৩) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সমাজসেবক এবং বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম প্রধান রূপকার। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী তাঁর জন্ম সালটি ১৮৬১ নয়, তিনি ১৮৬৩ সালে সিলেট শহরের পাঠানটোলায় জন্মগ্রহণ করেন।-অ

[33] "ডাল-ভাত" হলো বাংলায় ভাত ও ডাল দিয়ে তৈরি একটি সাধারণ খাবার।

[34] আজাদ, ৩১ অক্টোবর, ১৯৩৬। পৃ.৬।

[35] শিলা সেন, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৪।

[36]  দ্য মর্নিং নিউজ, ১৫ জুন, ১৯৬৯; এম. হায়দার, পরিশিষ্ট ১-এ। ভারত বিভক্তির আগে "লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান" ভারতীয় মুসলমানদের একটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল।

[37] প্রাগুক্ত।

[38] আজাদ, ৩১ অক্টোবর, ১৯৩৬। আরও দেখুন মহিউদ্দিন হায়দার, পৃষ্ঠা ১১০।

[39] শিলা সেন, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৩৬।

[40]- অ

[41] খেলাফত আন্দোলনের প্রাক্কালে ১৯১৯ সালে দেওবন্দী ওলামাদের দ্বারা জমিয়ত-উল-উলামা-ই-হিন্দ গঠিত হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক উভয় বিষয়েই মুসলমানদের পথপ্রদর্শন করা।

[42] এম.এস. আগওয়ানি, ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম ইন ইন্ডিয়া, নয়াদিল্লি, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ২৪-২৫।

[43] তদেব, পৃষ্ঠা ২৫।

[44] গোপাল কৃষ্ণ, "Piety and Politics in Indian Islam", টি.এন. মদন সম্পাদিত Muslim Communities of South Asia : Culture and Society, নতুন দিল্লি, ১৯৭৬, পৃ. ১৫২।

[45] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২।

[46] মাওলানা আকরম খাঁ, "Joint and Separate Electorates", মাসিক মোহাম্মদী, ৪র্থ বর্ষ, ১০ম সংখ্যা, ১৯৩১ (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ)।

[47] প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২২।

[48] বজলুর রহমান খান, পলিটিক্স ইন বেঙ্গল, ১৯২৭-১৯৩৬, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ১৫।

[49]  হারুন-অর-রশিদ, দ্য ফোরশ্যাডোয়িং অব বাংলাদেশ (বেঙ্গল মুসলিম লীগ অ্যান্ড মুসলিম পলিটিক্স, ১৯৩৬-১৯৪৭), এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ৩৮।

[50] বজলুর রহমান খান, "জয়েন্ট ইলেক্টরেটস ভার্সেস সেপারেট ইলেক্টরেটস : এ ডায়লেমা ফর দ্য বেঙ্গলি পলিটিশিয়ানস ইন দ্য ১৯২০-স অ্যান্ড দ্য ১৯৩০-স", দ্য জার্নাল অব দ্য ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, ভলিউম III, বার্ষিক, ঢাকা, ১৯৭৮।

[51] আকরাম খাঁ, মাসিক মোহাম্মদী, ৪র্থ বর্ষ, ১০ম সংখ্যা, ১৯৩১ (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ)

[52] প্রাগুক্ত।

[53] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, জীবনী, পৃষ্ঠা ৩০ - ৩১।

[54] আকরাম খাঁ, "সমস্যা ও তাদের সমাধান", মাসিক মোহাম্মদ, ১ম বর্ষ, ১২তম সংখ্যা, ১৯২৮ (১৩৩৫ বঙ্গাব্দ) "সমস্যা ও তাদের সমাধান", মাসিক মোহাম্মদী, ২য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ১৯২৮ (১৩৩৫ বঙ্গাব্দ)। ঐ, ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ১৯২৮ (১৩৩৫ বঙ্গাব্দ)।

[55]  আকরাম খাঁ, "সমস্যা ও তাদের সমাধান", মাসিক মোহাম্মদী, ১ম বর্ষ, ১২তম সংখ্যা, ১৯২৮ (১৩৩৫ বঙ্গাব্দ), পৃ. ৭১৬।

[56] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ১১–১২।

[57] মাওলানা আকরম খাঁ, “What is our mother-tongue?”, ১৯১৮ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির তৃতীয় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ, The Bangiya Musalman Sahitya Patrika, ১ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, ১৯১৮ (১৩২৫ বঙ্গাব্দ), পৃ. ৩০২। উল্লেখ্য, একই ভাষণে তিনি বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার গুরুত্বের ওপর জোর দিলেও বাংলা ভাষাকে তাঁদের জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকার করেননি। তাঁর মতে, তাঁদের জাতীয় ভাষা ছিল আরবি, পৃ. ৩০৮। (মূল বাংলা বক্তব্য থেকে ইংরেজি অনুবাদটি অনুবাদক কর্তৃক সম্পাদিত।)

[58] আজাদ, ৩১ অক্টোবর, ১৯৩৬, পৃষ্ঠা ৬।

[59] মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মোসলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস (মুসলিম বাংলার সামাজিক ইতিহাস), ঢাকা, ১৯৬৫।

[60] এই সংস্কার আন্দোলনগুলো আঠারো শতকে ভারতে শুরু হয়েছিল এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত চলেছিল। ওয়াহাবী আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৯১), যিনি শাইখুল ইসলাম ইমাম আহমদ ইবনে তাইমিয়া’র (১২৩৬-১৩২৮) আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। সুফিদের চিন্তাধারার ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং জোর দিয়েছিলেন যে রাজনীতি ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলন সংঘটিত হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন হাজী শরীয়তউল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০)। তিনি ফরাইজ অর্থাৎ মুসলমানদের ধর্মীয় কর্তব্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং হিন্দু রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত প্রথাগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ইসলাম থেকে সমস্ত শিরকবিদআত (অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড) নির্মূল করা। তারিকাহ-ই-মুহাম্মদীয়া (নবী মুহাম্মদ স. এর পথ) প্রবর্তন করেন রায়বেরেলির সৈয়দ আহমদ (১৭৮৬-১৮৩১) এবং এটি ইসলাম সংস্কারের প্রচেষ্টায় অধিকতর আপোষহীন ছিল।

[61] মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মোসলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৭৩। হিজরতের পর প্রথম শতাব্দীতে (৫৭৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম মুসলমানরা ভারতে এসেছিল।

[62] , পৃষ্ঠা ৭৩-৭৪।

[63] প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৫।

[64] প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৫।

[65] প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৩।

[66] অসীম রায়, দ্য ইসলামিক সিনক্রিটিস্টিক ট্র্যাডিশন ইন বেঙ্গল, প্রিন্সটন, ১৯৮৩। অসীম রায় বাংলায় ইসলামীকরণের প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। রায় বিপুল পরিমাণ লোকসাহিত্য ব্যবহার করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে বাংলায় ইসলামী ঐতিহ্য কীভাবে সমন্বয়বাদী ছিল।

[67] পুঁথি বা দোভাষী সাহিত্য আঠারো এবং উনিশ শতকের শুরুতে বাংলায় আবির্ভূত হয়েছিল যাতে আরবি, ফারসি এবং বাংলা শব্দের মিশ্রণ ছিল এবং এটি ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলে প্রচলিত একটি সমন্বিত সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়।

[68] আকরাম খাঁ, মোসলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ৮৩-৮৬।

[69] শ্রী চৈতন্য (১৪৮৬-১৫৩৩) বাংলার একজন হিন্দু মরমী সাধু যিনি বর্ণভেদ প্রথা অস্বীকার করেছিলেন এবং একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতেন। এই সম্প্রদায়টি সুফি মরমীবাদের অনুরূপ ছিল।

[70] মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, "হোসেন শাহ ও শ্রী চৈতন্য", মোসলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ৯৮ - ১১০।

[71] সত্যপীর ছিলেন একজন মুসলিম সাধু। আঠারো শতকে তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছিল কিন্তু ধারণা করা হয় যে সত্যপীর সম্প্রদায়ের উদ্ভব আরও আগে হয়েছিল। দেখুন, এম.আর. তরফদার, হোসেন শাহী বেঙ্গল (১৪৯৪-১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ) : এ সোশিও-পলিটিক্যাল স্টাডি, ঢাকা, ১৯৬৫। পৃ. ১৭-১৮, ১৬৫। তরফদার বাংলায় হোসেন শাহ সত্যপুর প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন - এই ধারণাটি নাকচ করে দেন। আকরাম খাঁ’র উৎস ছিল দীনেশচন্দ্র সেনের হিস্ট্রি অফ বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার, কলকাতা, ১৯৪৯। তরফদার এই উৎসটিকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না, যদিও তিনি বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে সত্যপীর-এর জনপ্রিয়তা অস্বীকার করেননি।

[72] মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মোসলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১০১।

[73] প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৪।

[74]  প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৪।

[75] প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭-১৪১।

[76] প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭। আকবর ১৫৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন; তিনি তেরো বছর বয়সে শাসক হন।

[77] প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৮-১২৯।

[78] ভি.এ. স্মিথ, আকবর, দ্য গ্রেট মোগল, অক্সফোর্ড, ১৯১৭; এম. টাইটাস, ইসলাম ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান, কলকাতা, ১৯৫৯; পি. স্পিয়ার, ইন্ডিয়া, আ মডার্ন হিস্ট্রি।

[79] মাওলানা আকরম খাঁ, মোসলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১২৮। এটি লক্ষ্য করা কৌতূহলোদ্দীপক যে মাওলানা আকরম খাঁ’র সমসাময়িক এস. ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১) আকবরকে তাঁর সমন্বয়বাদের জন্য প্রশংসা করেছিলেন। দেখুন, এস. ওয়াজেদ আলী, "আকবরের রাষ্ট্র সাধনা" (Akbar's State Policy), আকরম খাঁ সম্পাদিত এস. ওয়াজেদ আলী রচনাবলী (এস. ওয়াজেদ আলীর রচনাসমগ্র), ২য় খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৫, পৃ. ১-৯৯।

[80] মাওলানা আকরম খাঁ, মোসলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১৫৮।

 

লেখক ও অনুবাদক: আহমাদ বিন আব্দুস সালাম  শিক্ষার্থী: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

একবারে পুরো টাকা তুলতে পারবেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা

সংগ্রামের বর্ণিল চরিত্র মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ

পুলিশকে ঢেলে সাজাতে ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেট

জাপানে সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে লড়াইয়ের প্রত্যয় মারিয়াদের

বোলারদের ঘুরে দাঁড়ানোর পর ব্যাটিংয়ে হৃদয়-জাকেরের প্রতিরোধ

প্রত্যাশিত বড় জয়ে এশিয়া কাপ শুরু বাংলাদেশের

উজবেকিস্তানের কাছে হেরে এশিয়ান কাপ বাছাই শুরু বাংলাদেশের যুবাদের

মেসির বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: এক বিশ্বকাপজয়ী মহাকাব্য

শেষ হলো এক মহাকাব্য, নীল-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না মেসিকে

১০

ভারতের বাংলাদেশ সফর নিয়ে এখনও আশা ছাড়ছেন না তামিম

১১

দেশে প্রথম সফল রোবোটিক সার্জারি ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের দাবি

১২

৪৯ বছরে বিএনপি, এখনো পথনির্দেশক শহীদ জিয়ার ১৯ দফা

১৩

দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণই বিএনপির সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস : তারেক রহমান

১৪

গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও জনগণের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করেছে বিএনপি : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

১৫

মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কমে গেছে: মান্না

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত