বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রংপুরে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গুলিতে নিহত হন ৬ জন। আহত হন শতাধিক মানুষ। ঘটনার দুই বছর পার হলেও কোনো মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় অভিযোগপত্র দাখিল ঝুলে আছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
আন্দোলনকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর রংপুরে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯ জুলাই দুপুরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে ছাত্র-জনতার একটি মিছিল বের হলে সিটি বাজার এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা হামলা চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে নিহত হন ফল ব্যবসায়ী মেরাজুল, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল তাহির, ব্যবসায়ী সাজ্জাদ, স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী মোসলেম উদ্দিন, অটোরিকশাচালক মানিক ও যুবক মাহমুদুল হাসান মুন্না।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর নিহতদের স্বজনরা রংপুর কোতোয়ালি থানায় পৃথক ৬টি হত্যা মামলা করেন। এসব মামলায় মোট ২ হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে তৎকালীন রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার, ডিআইজি, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নাম রয়েছে।
এ পর্যন্ত সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদসহ ১২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ৬টি মামলার মধ্যে ৪টির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, দুই বছরেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তারা হতাশ। নিহত মেরাজুলের মা আম্বিয়া বেগম বলেন, “দুই বছর হয়ে গেল, খুনিদের কাউকেই ধরা হলো না। যারা গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিল, সেই পুলিশ ও প্রশাসনের বড় কর্মকর্তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? বিচার পাব কি না, তা নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে।”
একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী তাহিরের বাবা আবদুর রহমান, ব্যবসায়ী সাজ্জাদের স্ত্রী জিতু বেগম এবং মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা বেগম। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন মহানগর মুখ্য সমন্বয়ক নাহিদ হাসান খন্দকার বলেন, “যারা গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারাই মূল আসামি। অথচ দুই বছরেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তদন্তও শেষ হয়নি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে রংপুর সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, গুলিবর্ষণে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং একজন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার অনুমতি পাওয়া গেলেও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন এখনো মেলেনি। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ মাস ধরে সেই অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে সিআইডি। অনুমোদন পেলেই এক মাসের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।
শু/আজা