গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই এলাকার মুগ্ধ (২৩) ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থকে আটকের কথা জানায় পুলিশ। দুই আসামি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ফলে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি
রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা:
রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তার দুজনের পরিবারের সদস্যরা তাদের সন্তানদের জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত, তা আরও গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসের (১৯) জবানবন্দি নেওয়া হয়। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, দুই আসামি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ কারণে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
তবে পুলিশের এই বক্তব্যের মধ্যেই নতুন প্রশ্ন তুলেছেন আসামিদের স্বজনেরা। সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাসের প্রশ্ন, তার ছেলে যদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতই থাকত, তাহলে ঘটনার পর সে বাড়িতে থাকত কেন? তিনি নিজেই পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিয়েছিলেন।
সোমবার সাংবাদিকদের কানু দাস বলেন, নিহতদের বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধারের রাতে পুলিশ আশপাশের বাড়িগুলো সম্পর্কে জানতে চায়। পরে তার ছেলে মুগ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পুলিশকে নিয়ে মুগ্ধকে ডেকে আনতে যান। মুগ্ধ তখন তার ভাইয়ের বাসায় ঘুমাচ্ছিল। ঘুম থেকে ওঠার পর যে পোশাক পরা ছিল, সেটি পরেই সে পুলিশের সঙ্গে যায়। কানু দাস বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি জানতে পারেন, তার ছেলেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পরে শুনেছেন, ইয়াবা সেবন করে সে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু তার দাবি, ছেলের মধ্যে নেশাগ্রস্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ তিনি কখনো দেখেননি। তিনি বলেন, “আমার ছেলেতো নেশাগ্রস্ত ছিল না। এমন কোনোদিন কিছু দেখিনি। কারণবশত যদি হয়েও যায়, আমি আর কীভাবে বলব। কে কখন নেশা করে কেউ কি বলতে পারবে? কে চায় না তার ছেলে ভালো থাকুক।”
কানু দাসের ভাষ্য, তার ছেলের বিরুদ্ধে চুরি বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগও নেই। তিনি বলেন, মুগ্ধ হাসিখুশি স্বভাবের ছেলে, ছোটদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। ঘটনার আগের রাতেও ছেলে বাসায় ছিল এবং খাবার খাওয়ার পর ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলেছিল। পরে জানায়, সে সিদ্ধার্থের সঙ্গে থাকবে।
মুগ্ধের মা সেনা দাসও ছেলের জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার প্রশ্ন, মাত্র দুজন তরুণ কীভাবে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করতে পারে। তিনি বলেন, “ছেলে দুইটা উপযুক্ত না। নাকি এর পেছনে আরও কেউ আছে সেটা সঠিক তদন্ত করে দেখা হোক। যদি ছেলে এটা করে থাকে, তাহলে সে উচিত শাস্তি পাক। আর আমার ছেলে যদি দোষী না হয়, তাহলে তাকে ছাড়া হোক। একটা-দুইটা না চারটা মানুষকে হত্যা করা। দুইটা ছেলে কীভাবে করল, সেটাই প্রশ্ন।”
শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত গণপতির বয়স ৬৫ বছর, প্রীতিলতার ৫০ বছর, মেয়ে আগামীর ২৩ বছর এবং ছেলে আয়ুসের বয়স ১২ বছর। নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পুলিশ জানায়, রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে সিদ্ধার্থ রংপুর নগরীর একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কর্মরত।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ পেয়ে গণপতি ছাদে গেলে তাকে গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে আসামিরা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন।
পুলিশের দাবি, গণপতির চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে গেলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে মেয়ে আগামী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা ও রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুসকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর দুই তরুণ ওই বাড়িতেই কিছু সময় অবস্থান করেন। তারা বাথরুমে গোসল করেন, ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর ও শসা খান এবং পরে সেখানে আরও এক দফা ইয়াবা সেবন করেন।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের পর নিজেদের উপস্থিতির চিহ্ন মুছে ফেলতে নিহতদের দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে বাড়ির জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার পর সেগুলো মন্দিরের পেছনে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ।
তবে হত্যাকাণ্ডের ধরন নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনেরা চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো অবস্থায় দেখেছেন বলে জানান। মুখের কাছে তরল পদার্থও পাওয়া যায় বলে তারা জানান। এতে রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানিয়েছিলেন, মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থ রাসায়নিক কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, মরদেহ পচে যাওয়ার কারণেই মুখমণ্ডল এমন দেখাতে পারে। এসিডে ঝলসানোর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা। রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস আগে গণপতি ওই টাকা তুলেছিলেন। বাড়ির অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য তিনি টাকা তুলেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, নাকি বাড়িতে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ না হওয়ায় গণপতির শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী ও তার স্বামী বাড়িতে ছুটে যান। বাড়িটি তখন অন্ধকার ছিল। ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তারা প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে ছাদে ওঠেন। পরে একটি জানালার তালা ভেঙে ভেতরে তাকিয়ে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো দেখতে পান। একই সঙ্গে ভেতর থেকে দুর্গন্ধও পান তারা। পরে পুলিশ গিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
রোববার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতেই দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
চারজনকে হত্যার ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী রোববার কোতয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি; অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে দুই তরুণের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথা বলা হলেও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা তদন্তের নতুন দিক উন্মোচন করেছে। একই সঙ্গে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন, কথিত ইয়াবা সেবন এবং হত্যার পর ঘটনাস্থলকে ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টার বিষয়গুলোও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—পুলিশের হাতে থাকা আলামত, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ঘটনাস্থলের বাস্তব চিত্র কতটা মেলে। একই সঙ্গে আসামিদের স্বজনেরা যে প্রশ্ন তুলেছেন, হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।