ঢাকার সাভারে একটি মাজার ও বাড়িতে আয়োজিতব্য ওরস বাতিলের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ। ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে রোববার উপজেলা প্রশাসন ও থানায় বিক্ষোভ করে তারা স্মারকলিপি দেয়। তাদের অভিযোগ, ওই ওরসকে কেন্দ্র করে ইসলামবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়। সাভার উপজেলার বনগাঁও ইউনিয়নের চাকুলিয়া গ্রামে শাহ সুফি সৈয়দ মাওলানা কাজী আফসার উদ্দিন আল-জাহাঙ্গীর আল-সুরেশ্বরীর মাজার এবং তাঁর ছেলে কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরের বাড়িতে আগামী ২৬ ও ২৭ আগস্ট ওরস হওয়ার কথা রয়েছে। ওরস বন্ধের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সাভার মডেল থানাসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে ‘তৌহিদী জনতা’র পক্ষে ১০ জন স্বাক্ষর করেছেন। একই সঙ্গে সংগঠনটির সদস্যদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মধ্যে চাকুলিয়ার পীর সাহেব মাওলানা তৈয়বুর রহমান খান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানী, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার আমির মাওলানা আলী আকবর কাসেমী ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আলী আজম রয়েছেন। এ ছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীও অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।
অভিযোগে কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওরসকে কেন্দ্র করে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাবের আল-জাহাঙ্গীর। তাঁর দাবি, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে, তা সত্য নয়। তিনি কারও সঙ্গে ধর্মীয় বিরোধে জড়াতে চান না। কারও আপত্তি থাকলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে আলোচনায় বসতেও তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
জাবের বলেন, তাঁর বাবার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ১৯ বছর ধরে তাঁদের বাড়িতে ওরস হয়ে আসছে। এবারও বাড়ির সীমানার মধ্যেই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বাড়ির বাইরে কোনো প্যান্ডেল বা মাইক ব্যবহার করা হবে না।
একই সঙ্গে ওরসকে কেন্দ্র করে তাঁর বাড়িতে হামলার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি। এ বিষয়ে পুলিশি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়কে বিষয়টি জানিয়েছেন বলে জানান জাবের।
ওরস বাতিলের দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক বলেন, জাবেরের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। তবে তাঁর বক্তব্য কোরআন ও হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তাঁরা মনে করেন।
তিনি বলেন, বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের কারণে এলাকায় ভুল বোঝাবুঝি ও বিভ্রান্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত বছরও বিষয়টি নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল। এ কারণে আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
ইউসুফ সাদিকের ভাষ্য, ওরসের নামে এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যার ইসলামী ভিত্তি নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন করেছেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আলী আজম বলেন, এলাকাটি তাঁদের কাছাকাছি হওয়ায় স্থানীয় মুসল্লি ও আলেমরা মাঝেমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেন। স্থানীয় মানুষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বলে জানান তিনি।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ বিষয়টিকে ধর্মীয় বিরোধের চেয়ে আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। সাভার থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল বলেন, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য এলাকায় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কোনো ধরনের মারামারি, সহিংসতা বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য তিনি চান না।
সাভার থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মঞ্জু মোল্লাও বলেন, এলাকায় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁরা ‘তৌহিদী জনতার’ সঙ্গে আছেন এবং বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছেন।
সাভারের ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, যারা অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
এই বিরোধের পেছনে আগের একটি হামলার ঘটনাও রয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর জাবেরের ভাই কাজী গোলাম রাসুল সাভার মডেল থানায় তাঁদের বাড়িতে হামলার অভিযোগে মামলা করেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ‘তৌহিদী জনতা’র সদস্য পরিচয় দেওয়া প্রায় ৫০০ মানুষ লাঠি, দা, কুড়াল, লোহার পাইপসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাড়িতে ইট-পাথর নিক্ষেপ করে আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল ভাঙচুর করে এবং দুটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, হামলার সময় প্রায় ২০ লাখ টাকার সম্পদ লুট করা হয় এবং বাড়ির ভেতরে থাকা মাওলানা আফসার উদ্দিনের মাজার ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ রাত ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই ঘটনায় ২০ থেকে ২৫ জন আহত হন বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এবার একই স্থানকে ঘিরে আবারও ওরস বাতিলের দাবি ওঠায় স্থানীয়ভাবে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো ওরস বন্ধ বা অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।