দেশের সব উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ জন্য আলাদা সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি হাট-বাজারের ইজারালব্ধ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দেশের সব হাট-বাজারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর সংশ্লিষ্ট হাট বা বাজারের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় সরবরাহ করা বিদ্যুতের বিপরীতে প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে অর্থ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে হাট-বাজারের ইজারার অর্থ বিনিয়োগ করে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয়ের পথও তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-২ শাখা থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর জারি করা নির্দেশনায় দেশের সব উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব সুলতানা আক্তার স্বাক্ষরিত নির্দেশনাটি দেশের সব উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
নির্দেশনায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের অর্থের একটি নির্দিষ্ট উৎসও উল্লেখ করা হয়েছে। হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১০-এর উপবিধি (৩) ও (৫) অনুযায়ী হাট-বাজারের ইজারালব্ধ আয় থেকে এ কাজে অর্থ ব্যয় করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট হাট ও বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত ইজারালব্ধ আয়ের ১০ শতাংশ এবং উপজেলার অন্তর্গত হাট ও বাজারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত আরও ১০ শতাংশ অর্থ থেকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ হাট-বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত অর্থের একটি অংশ এখন সৌরবিদ্যুৎ অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে হাট-বাজার থেকে সংগৃহীত ইজারার অর্থই সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের অন্যতম অর্থায়ন উৎস হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলার সব হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট হাট ও বাজারের স্থায়ী শেডের ছাদ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন বাজারে নির্মিত চার-পাঁচতলা ভবনের ছাদের আয়তন বিবেচনায় নিয়ে সৌর প্যানেল স্থাপনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দেশনায় ন্যূনতম দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে শুধু দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রথমে সংশ্লিষ্ট হাট বা বাজারের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে হবে। এরপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং পদ্ধতিতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে অর্থ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যবস্থায় হাট-বাজারের অর্থ দিয়ে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু বিদ্যুতের ব্যয় কমানোর কাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না; অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আয়ও তৈরি করতে পারবে। ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সৌরবিদ্যুৎকে একটি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে যাতে নতুন করে সমস্যা তৈরি না হয়, সে বিষয়েও নির্দেশনায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করতে বলা হয়েছে। এতে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা যাবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ বলছে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে হাট-বাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পড়েছে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের ওপর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি হাট ও বাজারের উপযুক্ত ছাদ চিহ্নিত করা, ইজারালব্ধ অর্থের ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কারিগরি বিষয় এবং ২০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি—সবকিছু সমন্বয় করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারিকে সময়সীমা ধরে দেশের প্রতিটি উপজেলার হাট-বাজারে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের পাশাপাশি হাট-বাজারের নিজস্ব আয়কে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগের একটি নতুন ব্যবস্থাও কার্যকর হবে।