রংপুর নগরের একটি পূজামণ্ডপের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একাংশ। অন্যদিকে, জমি থেকে প্রতিমা সরিয়ে জায়গা খালি করার দাবিতে অবস্থান নেন জমির মালিক ও তাঁর লোকজন। বুধবার নগরের ঠিকাদারপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ দুই পক্ষকে নিয়ে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করলেও রাত পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০৭ সাল থেকে ঠিকাদারপাড়ায় দশরথ রায়ের তিন শতক জমিতে অস্থায়ীভাবে মন্দির স্থাপন করে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করা হচ্ছে। প্রতিবছর পূজা শেষে প্রতিমা সরিয়ে নেওয়া হতো। তবে চলতি বছর দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার পরও কালীপ্রতিমাসহ অন্য প্রতিমা সেখানে রেখে স্থায়ী মন্দির স্থাপনের প্রস্তুতি নেয় পূজা উদ্যাপন কমিটি।
বুধবার প্রতিমা বিসর্জনের সময় জমির সাবেক মালিক দশরথ রায় সব প্রতিমা সরিয়ে জমি খালি করার দাবি জানান। এ নিয়ে পূজা উদ্যাপন কমিটির সঙ্গে তাঁর বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে স্থায়ী মন্দির স্থাপনের দাবিতে কমিটির লোকজনসহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একাংশ প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে সড়ক অবরোধ করেন।
অন্যদিকে, জমি খালি করার দাবিতে দশরথ রায় ও তাঁর লোকজন সড়কের অপর পাশে অবস্থান নেন। জমির মালিকপক্ষের দাবি, মন্দিরের পুরোনো ও নতুন সব প্রতিমা সরিয়ে জমি খালি করে দিতে হবে।
বুধবার সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখেন বিক্ষোভকারীরা। রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পুলিশ দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করে। তবে কোনো সমাধান না হওয়ায় পরে বিক্ষোভকারীরা সড়ক থেকে সরে যান। এরপরও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
জমির মালিকানা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
জমিটির বর্তমান মালিক হিসেবে দাবি করা রিতা রাণী বলেন, জমিটি তাঁর স্বামী দশরথ রায়ের পৈতৃক সম্পত্তি। তাঁর স্বামী তিন শতক জমি তাঁর নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন। রিতা রাণীর দাবি, ওই জমিতে তাঁদের অটোরিকশার গ্যারেজ ছিল। পূজার সময় গ্যারেজ সরিয়ে নেওয়া হতো এবং পূজা শেষে আবার সেখানে গ্যারেজ চালু করা হতো। এবার পূজা উদ্যাপন কমিটি পুরো জমি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রিতা রাণী বলেন, “সরকার বাহাদুরের কাছে আমার দাবি, আমার জমি আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।”
অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা প্রাণ গোস্বামীর দাবি, স্থায়ী মন্দির নির্মাণের জন্য জমিটি কিনতে তিনি দশরথ রায়কে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে একটি বায়নাপত্রও হয়েছিল বলে জানান তিনি। প্রাণ গোস্বামী বলেন, বায়নাপত্র অনুযায়ী জমিটির মালিকানা তাঁর হওয়ার কথা থাকলেও দশরথ রায় জমি রেজিস্ট্রি করে দেননি। পরে জমিটি তাঁর স্ত্রী রিতা রাণীর নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে জানিয়ে প্রাণ গোস্বামী বলেন, আদালত তাঁদের সেখানে পূজা করার অনুমতি দিয়েছেন। সেই অনুমতির ভিত্তিতেই এবারও সেখানে পূজা উদ্যাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কোতোয়ালি থানার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি বলেন, পূজা উদ্যাপন কমিটির লোকজন প্রতিমা বিসর্জন দিতে রাজি হলেও মন্দিরের জায়গা খালি করতে চান না। তাঁরা মন্দিরের দখল ধরে রাখতে চান বলে জমির মালিকপক্ষের অভিযোগ। অন্যদিকে, জমির মালিকপক্ষ সব প্রতিমা সরিয়ে জমি খালি করার দাবি জানিয়েছে।
পুলিশ দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিরোধের সমাধানের চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকার কথা দুই পক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে আদালতের আদেশের প্রকৃত বিষয়বস্তু এবং জমির মালিকানা-সংক্রান্ত নথি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবিকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত বলা যাচ্ছে না।