একসময় মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোন বলতে আকাশে তুলনামূলক ধীরগতির একটি লক্ষ্যকেই বোঝানো হতো। ফলে রাডারে শনাক্ত হওয়ার পর প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে এগুলো ধ্বংস করার জন্য প্রতিপক্ষের হাতে কিছুটা সময় থাকত। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা সেই ধারণা দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ইরানের শাহেদ পরিবারের জেটচালিত নতুন সংস্করণ শাহেদ-২৩৮ সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ।
শাহেদ-১৩৬-এর পিস্টন ইঞ্জিন ও প্রপেলারের পরিবর্তে টার্বোজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে শাহেদ-২৩৮। এর ফলে আগের সংস্করণের তুলনায় এর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও উন্মুক্ত সূত্রে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বলা হয়েছে। তবে সংস্করণ, উড্ডয়ন পরিস্থিতি ও পরিচালন পদ্ধতির ওপর প্রকৃত গতি পরিবর্তিত হতে পারে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) শাহেদ-২৩৮-এর গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করেছে।
এই গতিই শাহেদ-২৩৮-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো আকাশ লক্ষ্যকে প্রতিহত করার সক্ষমতা শুধু সেটি কতটা বড় বা কতটা শক্তিশালী, তার ওপর নির্ভর করে না; সেটি কত দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দ্রুতগতির ড্রোন শনাক্ত করার পর সেটির গতিপথ নির্ধারণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং উপযুক্ত ইন্টারসেপ্টর দিয়ে ধ্বংস করার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতে সময় কমে যায়।
শাহেদ-২৩৮ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয় ২০২৩ সালে। এটি মূলত প্রচলিত শাহেদ-১৩৬-এর জেটচালিত সংস্করণ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। প্রকাশ্য সামরিক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের শুরুতেই রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে এই ধরনের জেটচালিত শাহেদ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে রাশিয়াও এর নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করে, যা ‘গেরান-৩’ নামে পরিচিত।
### প্রপেলার থেকে টার্বোজেট
শাহেদ-১৩৬-এর মূল শক্তি ছিল এর সরল নকশা, দীর্ঘ পাল্লা এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়। কিন্তু এর পিস্টন ইঞ্জিন ও প্রপেলারভিত্তিক propulsion ব্যবস্থার কারণে এর গতি সীমিত। শাহেদ-২৩৮ সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে টার্বোজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করেছে।
ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণে অন্তত কয়েকটি শাহেদ-২৩৮-এ চেক প্রজাতন্ত্রের PBS TJ150 ধরনের টার্বোজেট ইঞ্জিন শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণধর্মী সূত্র। অর্থাৎ ইরানের নিজস্ব উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তি ও উপাদানও এই ড্রোন পরিবারের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
টার্বোজেট ব্যবহারের ফলে গতি বাড়লেও এর বিনিময়ে কিছু সক্ষমতা কমতে পারে। একই আকারের এয়ারফ্রেমে জেট ইঞ্জিন বসালে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, ওজন, তাপীয় স্বাক্ষর এবং উড্ডয়নকাল—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে শাহেদ-২৩৮কে শাহেদ-১৩৬-এর সরাসরি উন্নত সংস্করণ বলার পাশাপাশি এটিকে ভিন্ন অপারেশনাল প্রয়োজনের জন্য তৈরি একটি সংস্করণ হিসেবেও দেখা যায়।
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, শাহেদ-২৩৮-এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিটার এবং ডানার বিস্তার প্রায় ৩ মিটার। বিভিন্ন সংস্করণে ওয়ারহেডের ওজন ৫০ থেকে ৯০ কেজির মধ্যে হতে পারে বলে সিএসআইএস জানিয়েছে। ফলে সব শাহেদ-২৩৮-এর সক্ষমতা এক নয়—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
### গতি বাড়ার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে আকাশ প্রতিরক্ষার হিসাব
শাহেদ-২৩৮-এর গুরুত্ব শুধু ঘণ্টায় কয়েক শ কিলোমিটার বেশি গতিতে উড়তে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত সামরিক মূল্য তৈরি হয় যখন দ্রুতগতির এই ড্রোনকে একই আক্রমণে ধীরগতির ড্রোনের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
শাহেদ-১৩১ বা শাহেদ-১৩৬-এর মতো তুলনামূলক ধীর ড্রোনের বড় বহর একদিকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার ও অপারেটরদের ব্যস্ত রাখতে পারে। একই সময়ে দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন পাঠানো হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য হুমকিগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ এখানে শুধু একটি ড্রোন ধ্বংস করার প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, একসঙ্গে বহু লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কোনটিকে আগে মোকাবিলা করা হবে, কোন ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হবে এবং প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুর জন্য কত সময় ও সম্পদ ব্যয় করা হবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে শাহেদ পরিবারের ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করতে হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেট ইঞ্জিনযুক্ত দ্রুতগতির শাহেদ মোকাবিলায় ইউক্রেন নিজস্ব ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, স্বয়ংক্রিয় নির্দেশনা এবং অন্যান্য প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সমীকরণ। আক্রমণকারী তুলনামূলক কম খরচে একটি ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করতে পারে। তবে শাহেদ-২৩৮কে এককভাবে ‘অত্যন্ত সস্তা’ বলা নিয়েও সতর্কতা প্রয়োজন। জেট ইঞ্জিনের কারণে এর উৎপাদন ব্যয় শাহেদ-১৩১ বা শাহেদ-১৩৬-এর চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### শুধু গতি নয়, নির্দেশনাতেও পরিবর্তন
শাহেদ-২৩৮ পরিবারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিভিন্ন ধরনের guidance system। প্রকাশ্য গবেষণায় কিছু সংস্করণে ইনর্শিয়াল নেভিগেশন ও স্যাটেলাইট নেভিগেশনের পাশাপাশি ইনফ্রারেড, অপটিক্যাল এবং রাডারভিত্তিক নির্দেশনা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, রাডার-হোমিং সংস্করণগুলো শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডারকে লক্ষ্য করতেও ব্যবহৃত হতে পারে।
এ ধরনের সক্ষমতা যুক্ত হলে ড্রোনটি কেবল স্থির কোনো অবকাঠামো বা পূর্বনির্ধারিত স্থানকে আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। নির্দিষ্ট ধরনের সামরিক সেন্সর বা রাডারকে লক্ষ্য করার সক্ষমতাও তৈরি হতে পারে। তবে কোন সংস্করণে বাস্তবে কী ধরনের seeker বা guidance system ব্যবহৃত হচ্ছে, তা সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
### রাশিয়ায় শাহেদ থেকে গেরান
ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির প্রভাব এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া শাহেদ নকশার ব্যাপক ব্যবহার করেছে এবং ধীরে ধীরে নিজস্ব উৎপাদন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে এর নতুন সংস্করণ তৈরি করেছে।
সিএসআইএসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার গেরান কর্মসূচির বড় বৈশিষ্ট্য হলো যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্রুত নকশা পরিবর্তন। নেভিগেশন, যোগাযোগ, ওয়ারহেড, propulsion এবং কৌশলে ধারাবাহিক পরিবর্তন এনে রাশিয়া ড্রোনগুলোকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। জেটচালিত গেরান-৩ ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ মাইল পর্যন্ত গতি অর্জন করতে পারে বলে ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ, শাহেদ-২৩৮ শুধু একটি নির্দিষ্ট ড্রোন মডেল নয়; বরং একটি নকশা ও প্রযুক্তিগত ধারণার বিবর্তনের অংশ। একদিকে ইরান নতুন সংস্করণ তৈরি করছে, অন্যদিকে রাশিয়া একই পরিবারের নকশা নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা ও যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করছে।
### ‘কম খরচে বেশি চাপ’—কতটা কার্যকর?
শাহেদ পরিবারের সাফল্যের অন্যতম কারণ এর তুলনামূলক সরল নকশা। কিন্তু শাহেদ-২৩৮ সেই সরলতার সঙ্গে গতি ও উন্নত guidance প্রযুক্তি যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। ফলে এর সঙ্গে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষার প্রতিযোগিতাও বদলাচ্ছে।
তবে এটিকে যুদ্ধের ফল নির্ধারণকারী কোনো ‘অজেয় অস্ত্র’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জেটচালিত ড্রোনের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বেশি গতি মানেই বেশি কার্যকর—এমন সরল সমীকরণও নেই। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ধারণক্ষমতা, পাল্লা, রাডার ও তাপীয় স্বাক্ষর, electronic warfare-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়েই একটি ড্রোনের কার্যকারিতা নির্ধারিত হয়।
বরং শাহেদ-২৩৮-এর তাৎপর্য অন্য জায়গায়। এটি দেখাচ্ছে, তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনও ধীরে ধীরে দ্রুততর, বেশি বৈচিত্র্যময় এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হয়ে উঠছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এর ফলে আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর শুধু সংখ্যার চাপ নয়, সময়ের চাপও তৈরি হচ্ছে।
আর এ কারণেই আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এখন শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নিয়ে নয়। কে দ্রুত শনাক্ত করতে পারছে, কে কম খরচে প্রতিহত করতে পারছে এবং কে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে নতুন কৌশল প্রয়োগ করতে পারছে—সেই প্রতিযোগিতাই ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শাহেদ-২৩৮ হয়তো একাই কোনো যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে না। কিন্তু শাহেদ-১৩৬-এর মতো ধীরগতির ড্রোনের সঙ্গে জেটচালিত দ্রুত সংস্করণের সমন্বয় দেখিয়ে দিয়েছে, কম ব্যয়ের আকাশযানও কীভাবে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। ইরানের এই ড্রোন পরিবারের বিবর্তন তাই শুধু একটি অস্ত্রের উন্নয়ন নয়; এটি দ্রুত বদলে যাওয়া ড্রোন যুদ্ধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।