ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে সাময়িক মেঘ বা ঝড় এলেও দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধন তা মুছে দিতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর। তাঁর মতে, সম্পর্কের মধ্যে উত্থান-পতন থাকলেও ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত যোগসূত্রের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থের জায়গা থেকে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। রোববার (৪ অক্টোবর) ঢাকায় অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল কনফারেন্সে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে এম জে আকবর বলেন, দুই দেশের সম্পর্কে সাময়িক মেঘ বা ঝড় আসতেই পারে। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী বন্ধনকে মুছে দিতে পারবে না। বিদ্যমান মতপার্থক্য ও সমস্যাগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই সভ্যতাগত রাষ্ট্র। বাংলাদেশের পরিচয় কোনো কৃত্রিমভাবে তৈরি রাষ্ট্রের পরিচয় নয়; বরং ভাষার শক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সভ্যতাগত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের উত্থান-পতনকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে এম জে আকবর বলেন, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে শুধু ‘কী সম্ভব’—এই প্রশ্নের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। একই সঙ্গে ‘কেন এটি অসম্ভব’—এই প্রশ্নও করতে হবে। এভাবে চিন্তা করলে নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি হতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে যেসব প্রশ্ন ও সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির পাশাপাশি সম্পর্কের বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত প্রেক্ষাপট বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে এম জে আকবর বলেন, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব সম্মানিত না হলে বিশ্ব ক্রমেই বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সম্মান করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন ভারতের সাবেক এই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো যুদ্ধকে অবৈধ বলার আগে তার উৎস ও পটভূমি খুঁজে দেখা প্রয়োজন। একটি সংঘাতের দৃশ্যমান ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিচার না করে এর পেছনে থাকা ইতিহাস ও কারণও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিংশ শতাব্দীর সংঘাতের ইতিহাস তুলে ধরে এম জে আকবর বলেন, বিংশ শতাব্দীকে তিনটি বিশ্বযুদ্ধের শতাব্দী হিসেবেও দেখা যায়। ঠান্ডা যুদ্ধকেও তিনি এক ধরনের বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ইউরোপে এটি ‘ঠান্ডা’ থাকলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অঞ্চলে এর প্রভাব মোটেও ঠান্ডা ছিল না।
তিনি বলেন, এসব সংঘাতকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হয়েছিল এ কারণে নয় যে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। বরং বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরাশক্তি ও সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে যে সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের ধরন আগের শতাব্দীর তুলনায় ভিন্ন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এম জে আকবরের ভাষ্য, বর্তমান সময়ের সংঘাতকে একটি একক বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে দেখা যায় না। বরং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান ধারাবাহিক সংঘাতের একটি চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে।
তাঁর মতে, এসব সংঘাত সব সময় একটানা চলে না। কোনো কোনো সময় সংঘাত তীব্র আকার নেয়, পরে কিছুটা স্তিমিত হয়; কিন্তু পুরোপুরি থেমে যায় না। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।
বে অব বেঙ্গল কনফারেন্সে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি, সার্বভৌমত্ব এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হয়। সম্মেলনে বক্তাদের আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে এম জে আকবরের বক্তব্যে তাৎক্ষণিক মতপার্থক্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্কের পথ সব সময় মসৃণ নাও হতে পারে; তবে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে মোকাবিলা এবং নতুন সম্ভাবনা খোঁজার সুযোগ সব সময়ই রয়েছে।