জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে যোগ; বিশ্বব্যাংক, হাইতি, ভুটান ও মালদ্বীপের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
এর আগে স্থানীয় সময় সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৮১তম সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী কার্যক্রম ও উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে যোগ দেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘রেস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: আ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভার্স ফর অল’—অর্থাৎ আস্থা পুনরুদ্ধার ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা আরও জোরদার এবং ভবিষ্যতে অংশীদারত্বের নতুন ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও দুই পক্ষ মতবিনিময় করে।
এ বৈঠক সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরে সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিভিন্ন কর্মসূচিতেও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এরপর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিস-আইমের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও হাইতির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের জনগণের কল্যাণে সহযোগিতা আরও জোরদার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ. হুসেইন মোহামেদ লতিফের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে রোহিঙ্গা সংকটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সফরসূচি অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের একটি সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন তিনি। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাওয়ার কথা রয়েছে। সাইড ইভেন্টটির শিরোনাম ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: আ রিনিউড কল ফর আ ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতিরও সাম্প্রতিক আলোচনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠকে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি এবং সংকটের মূল কারণ মোকাবিলার মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে জাতিসংঘে তাঁর প্রথম ভাষণ। সফরসূচি অনুযায়ী, তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাতিসংঘ সফর শুরু হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর। ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্কে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।