২১ বছর পর জানতে পারেন জন্মগতভাবেই তাঁর একটি কিডনি নেই; এখন সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস
ক্রিকেটারদের জন্য ফিটনেসের গুরুত্ব আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে ঘরোয়া ক্রিকেট, প্রথম শ্রেণি থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন—প্রতিটি ধাপেই কঠোর শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় একজন ক্রিকেটারকে। অথচ জন্মগতভাবেই একটি কিডনি না থাকার বিষয়টি না জেনেই পুরো খেলোয়াড়ি জীবন পার করেছেন বাংলাদেশের সাবেক অফ স্পিনার ফাহিম মুনতাসির (সুমিত)।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের প্রায় ২১ বছর পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর শরীরে জন্মগতভাবেই একটি কিডনি নেই। প্রথম আলোকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দিল্লিতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে।
ফাহিমের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল বয়সভিত্তিক দল দিয়ে। ১৯৯৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে প্লেট চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। এরপর ২০০০ সালে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিষেক টেস্টের স্কোয়াডেও ছিলেন।
২০০১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় ফাহিমের। পরের বছর জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক। জাতীয় দলের হয়ে তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলেছেন তিনি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর ম্যাচ ৩৭টি এবং লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে খেলেছেন ৩৩টি ম্যাচ।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিয়মিত বোলিং করার পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও ছিলেন সক্রিয়। তাঁর সঙ্গে বয়সভিত্তিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা সতীর্থদের ভাষ্য, ফাহিম ছিলেন দলের অন্যতম ফিট ক্রিকেটার। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার ও সাবেক ক্রিকেটার হান্নান সরকারও তাঁর ফিটনেসের প্রশংসা করেছেন।
অর্থাৎ, শরীরে একটি কিডনি না থাকার বিষয়টি পুরো ক্যারিয়ারেই তাঁর অজানা ছিল। এ কারণে মাঠে খেলার সময়ও এ নিয়ে কোনো শারীরিক সমস্যা অনুভব করেননি তিনি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ মানুষের শরীরে দুটি কিডনি থাকলেও কিছু মানুষ জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়েই জন্মান। এমন অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে অবশিষ্ট কিডনি আকার ও কার্যক্ষমতায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে শরীরের প্রয়োজন মেটাতে পারে। তবে একমাত্র কিডনিতে গুরুতর আঘাত বা ক্ষতি হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ফাহিমের ক্ষেত্রে সেই শারীরিক বাস্তবতা ধরা পড়েছে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার অনেক পরে। ২০২৩ সালে দিল্লিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় জানা যায়, তাঁর বাঁ পাশের কিডনি নেই। এরই মধ্যে অবশিষ্ট কিডনিটির কার্যক্ষমতাও কমতে শুরু করেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে সাবেক এই ক্রিকেটারকে। চিকিৎসকেরা দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। এর জন্য প্রয়োজন বড় অঙ্কের অর্থ।
### ক্রিকেটের বাইরে নতুন লড়াই
ক্রিকেট ছাড়ার পরও ফাহিম ক্রিকেটের সঙ্গেই ছিলেন। লেভেল-২ কোচিং কোর্স সম্পন্ন করে ঘরোয়া ক্রিকেটে কোচিং করিয়েছেন। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মতো বড় দলের সঙ্গে কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনেও এই ক্লাবের হয়ে নিয়মিত খেলেছেন তিনি।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে আসা বিদেশি দলগুলোর লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবেও কাজ করেছেন।
কিন্তু এখন তাঁর লড়াই মাঠের বাইরে। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে তাঁকে। এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন ফাহিম। তাঁর মতে, পেশাদার ক্রিকেটারদের খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে নির্দিষ্ট পেনশন বা স্বাস্থ্য তহবিল থাকা প্রয়োজন।
একসময় জাতীয় দলের হয়ে বল হাতে মাঠে নামা ফাহিম এখন নিজেই জীবনের কঠিন এক ম্যাচে লড়ছেন। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় শরীরে একটি কিডনি না থাকার বিষয়টি না জেনেও ক্রিকেট খেলে যাওয়া তাঁর গল্পকে যেমন বিরল করে তুলেছে, তেমনি অবসর নেওয়ার পর সাবেক খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টিও সামনে এনেছে।