মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযান, আটক ও প্রত্যাবাসন কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে। কর্মক্ষেত্র, নির্মাণাধীন ভবন, কারখানা, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে আটক হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিক। বৈধ কাগজপত্র না থাকা, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া কিংবা কর্মানুমতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন অনেকে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে গত বুধবার (২১ অক্টোবর) বাংলাদেশিসহ ১৫৭ জন অভিবাসীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ। পুনঃপ্রবেশ ঠেকাতে তাঁদের কালো তালিকাভুক্তও করা হয়েছে। তবে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, তা জানানো হয়নি।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ কেদাহ রাজ্য শাখার তথ্য অনুযায়ী, ফেরত পাঠানো ১৫৭ জনের মধ্যে ১২৮ জন পুরুষ, ২৬ জন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে। তাঁদের নাগরিকত্বের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, অস্ট্রেলিয়া, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার রয়েছে।
কেদাহ রাজ্যের সিক এলাকার বেলান্তিক অভিবাসন আটককেন্দ্রে তাঁদের আটক রাখা হয়েছিল। মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইনে সাজা ভোগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। ২১ জন কর্মকর্তা এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং নিজ নিজ দেশের দূতাবাস বিমানভাড়ার ব্যয় বহন করেছে বলে জানিয়েছে অভিবাসন বিভাগ। প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের মালয়েশিয়ায় পুনঃপ্রবেশ ঠেকাতে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এক বছরে আটক ৬৫ হাজারের বেশি
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ১১ হাজার ১১০টি অভিযান চালিয়ে ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন অনিয়মিত অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। এ সময়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৫৩ জনের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয় ১ হাজার ৯৬৬ জন নিয়োগকর্তাকেও। আর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৫৯৭ জন বিদেশিকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
তবে আটক ও প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা সামগ্রিক পরিসংখ্যানে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অভিযানের তীব্রতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১২ থেকে ১৬ অক্টোবর—এই পাঁচ দিনে ২৫২টি অভিযান চালিয়ে ৪ হাজার ৯০৭ জনের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। এ সময় ২ হাজার ১৫৬ জন বিদেশিকে আটক করা হয়। পাশাপাশি ৫১ জন নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ বলছে, বৈধ ভ্রমণ নথি বা অবস্থানের অনুমতি না থাকা, ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করা এবং অনুমোদিত শর্তের বাইরে কাজ করা অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ। সামাজিক ভ্রমণ ভিসায় প্রবেশ করে বৈধ কর্মানুমতি ছাড়া কাজ করাও অপরাধের আওতায় পড়ে। ফলে বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করলেও ভিসা ও কর্মানুমতির শর্ত ভঙ্গ করলে আটকের ঝুঁকি রয়েছে।
অভিযানে আটক বাংলাদেশিরাও
এর আগেও মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন অভিযানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি আটক হয়েছেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরের লেবুহ পুদু এলাকায় সমন্বিত অভিযানে প্রায় আড়াই হাজার বিদেশির কাগজপত্র যাচাই করে ৪৭২ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৩৬৪ জন ছিলেন বাংলাদেশি।
এ ছাড়া ৮ অক্টোবর সেলাঙ্গরের সেরি কেম্বাঙ্গান ও বান্দার বারু ক্লাং এলাকায় অভিযানে ৩০৭ জনের কাগজপত্র যাচাই করে ১৭৪ জন বিদেশিকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি ছিলেন। ওই অভিযানে ছয়জন স্থানীয় নিয়োগকর্তাকেও আটক করা হয়।
অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ শুধু বিদেশি কর্মীদের বিরুদ্ধে নয়, তাঁদের নিয়োগ দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ৪ কোটি ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫০ রিঙ্গিত জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে বিদেশি অভিবাসীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ৩ কোটি ৭১ লাখ ২৩ হাজার ৪২০ রিঙ্গিত।
স্বেচ্ছায় ফেরার কর্মসূচিতেও নিবন্ধন
অনিয়মিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দিতে মালয়েশিয়ায় চলছে ‘মাইগ্র্যান্ট রিপ্যাট্রিয়েশন প্রোগ্রাম ২.০’। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ কর্মসূচিতে ৩ লাখ ১২ হাজার ১৪৬ জন নিবন্ধন করেছেন। এ থেকে আদায় হয়েছে ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৪০ রিঙ্গিত।
তবে নিবন্ধনের সংখ্যা মানেই সবাই দেশে ফিরে গেছেন, এমন নয়। নিবন্ধন, জরিমানা পরিশোধ ও প্রকৃত প্রত্যাবাসনের হিসাব আলাদা। কর্মসূচিতে কতজন বাংলাদেশি নিবন্ধন করেছেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরেছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনিশ্চয়তায় প্রবাসী পরিবারগুলো
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই পরিবারের ভরণপোষণ, ঋণ পরিশোধ ও স্বজনদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। তাঁদের কেউ কেউ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রতারণা, প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া কিংবা কর্মানুমতি-সংক্রান্ত জটিলতায় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে যান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কর্মানুমতি নবায়নে গড়িমসি করেন। আবার দেশে ফেরার খরচ জোগাড় করতে না পেরে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনিয়মিত অবস্থায় থেকে যান কিছু কর্মী।
তবে সব কর্মীর পরিস্থিতি এক নয়। কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হতে পারে, কারও নথিপত্রে ত্রুটি থাকতে পারে, আবার কারও বিরুদ্ধে অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকতে পারে। তাই আটক হওয়া প্রত্যেক বাংলাদেশিকে একইভাবে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত না করে ব্যক্তির নথি ও অভিযোগ যাচাই করে আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী কমিউনিটি নেতা বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সচল থাকে বহু পরিবারের জীবন-জীবিকা। বিদেশে এসে কোনো কর্মী প্রতারণা, অনিয়মিত নিয়োগ কিংবা কাগজপত্রের জটিলতায় পড়লে সেই সমস্যার দায় শুধু তাঁর ওপর চাপিয়ে দিলে মূল কারণ আড়ালেই থেকে যায়।
বৈধতা যাচাই ও কনস্যুলার সহায়তা জরুরি
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট, ভিসা ও কর্মানুমতির মেয়াদ নিয়মিত যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের অভিবাসন-সংক্রান্ত বৈধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কাগজপত্রে সমস্যা দেখা দিলে দালালের কাছে নতুন করে অর্থ না দিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ নিয়োগপত্র, ভিসা ও কর্মানুমতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা, প্রতারণাকারী মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংকটে পড়া কর্মীদের দ্রুত আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং বৈধ কর্মসংস্থানের পথ নিরাপদ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে মালয়েশিয়ার আইন প্রয়োগ অব্যাহত থাকলেও প্রতারণার শিকার কর্মী, বৈধ কাগজপত্রধারী শ্রমিক ও আইন লঙ্ঘনকারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা জরুরি। প্রবাসীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় শুধু অভিযান নয়, অবৈধ নিয়োগ ও প্রতারণার উৎস বন্ধ করাও প্রয়োজন।