হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্যকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন নাকচ করেছেন আদালত। এক দিনের রিমান্ড শেষে রোববার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলম তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
তবে জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতকক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিচারক কিছু সময়ের জন্য এজলাস থেকে নেমে যান। পরে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রিমান্ড শেষে রোববার দুপুরে আখতারুজ্জামানকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করে পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ জামিনের আবেদন করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, প্রতিবাদ করা অপরাধ নয়। তবে প্রতিবাদের ভাষা ও ধরন অস্বাভাবিক হলে তা অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে। তাঁর অভিযোগ, বিমানবন্দরে আখতারুজ্জামান একজন কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে অপমান করেছেন। জমজমের পানি নিক্ষেপের ঘটনাটিও পরিকল্পিত হতে পারে বলে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি আদালতকে জানান।
পিপি আরও বলেন, আখতারুজ্জামান জামিনে মুক্তি পেলে মামলার তদন্তে বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিমানবন্দরে কী উদ্দেশ্যে এবং কার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ কারণে তাঁকে জামিন না দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, এক দিনের রিমান্ডে আখতারুজ্জামান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। মামলার তদন্ত চলছে এবং বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ অবস্থায় তাঁকে আরও আটক রাখা প্রয়োজন।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক জামিনের পক্ষে শুনানিতে বলেন, বিমানবন্দরের অনিয়মের প্রতিবাদ করেছিলেন আখতারুজ্জামান। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, আখতারুজ্জামান গুরুতর অসুস্থ। তাঁর ডায়াবেটিস ও হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো শর্তে তাঁকে জামিন দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
শুনানি শেষে জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর আখতারুজ্জামান এজলাসে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দেন বলে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে উপস্থিত আইনজীবীরা তাঁকে থামতে বলেন।
এর আগে শনিবার আখতারুজ্জামানকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার সময়ও আদালতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ওই দিন তাঁকে আদালতে নেওয়ার সময় প্রিজন ভ্যান থেকে নামার পর হেলমেট ছুড়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। শুনানিতে বিচারককে উদ্দেশ করে বিরূপ মন্তব্য করার অভিযোগও তুলেছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তবে তাঁর আইনজীবী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, আখতারুজ্জামান আদালতে কোনো ধরনের অবমাননাকর বক্তব্য দেননি।
### আদালতের বাইরে হাতাহাতি
রোববার আখতারুজ্জামানকে আদালতে তোলার পর থেকেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় বিচারক কিছু সময়ের জন্য এজলাস থেকে নেমে যান।
শুনানি চলাকালে আখতারুজ্জামানের মুক্তির দাবিতে ঢাকার সিএমএম আদালত ভবনের সামনে জামায়াতের কয়েকজন নেতা-কর্মী স্লোগান দেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ সদস্য ও উভয় পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
মামলাটি করা হয় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলির সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির ঘটনায়। পুলিশ ও মামলার নথির বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা একটি বিমান থেকে যাত্রীরা নামার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। এতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পরিস্থিতি দেখতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে গেলে আখতারুজ্জামান তাঁর দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং হুমকি দেন বলে পুলিশের অভিযোগ।
ওই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হওয়ার পর শুক্রবার রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের ডিওএইচএসের বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। শনিবার পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে রোববার তাঁকে কারাগারে পাঠানো হলো।
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তি ও অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও তাঁর গ্রেপ্তারের সমালোচনা করে মুক্তি দাবি করা হয়েছে। ফলে মামলার অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপরই এখন বিষয়টির আইনি পরিণতি নির্ভর করছে।