সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিকে ‘আমরা-মামুরা সংশোধন কমিটি’ বলে মন্তব্য করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করা অনেককে পদ, চেয়ার কিংবা মন্ত্রণালয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর এসব বক্তব্যের পক্ষে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম বা তথ্য তুলে ধরেননি।
রোববার (৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘এটি আসলে একটি আমরা-মামুরা সংশোধন কমিটি। আপনারা দেখেছেন, সংস্কারের জন্য যারা দীর্ঘদিন বিভিন্ন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, একটি চেয়ার, পদ কিংবা মন্ত্রণালয়ের লোভ দেখিয়ে তাঁদেরও এখন কিনে নেওয়া হয়েছে।’ তাঁর ভাষ্য, শেষ পর্যন্ত জনগণই তাঁদের মূল্যায়ন করবে এবং তাঁদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, মৌলিক সংস্কারগুলো পাশ কাটানোর জন্যই শুরুতে গণভোটের বিরোধিতা করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, গণভোটের ফলাফলের ক্ষেত্রেও সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানে দ্বিমুখিতা দেখা গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘একটি অংশ মেনে নিয়েছে, কিন্তু অন্যটি মেনে নেয়নি।’ এ কারণে সরকার মানুষের আস্থা হারিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আলুর বাজার নিয়ে আগে দেওয়া একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গও টেনে আনেন হাসনাত। তিনি বলেন, বগুড়া আলু উৎপাদনের অন্যতম প্রধান এলাকা হলেও সেখানে কৃষকেরা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্য, মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়ে থাকলে সেই সংস্কার বাস্তবায়নের পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতেও সরকারের কার্যকর নীতি নেওয়া উচিত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর দাবি, ২০০৬ সালের মতো একদলীয় নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি নতুন কোনো ‘ফর্মুলা’ সামনে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো ব্যবস্থা প্রবর্তনের পাশাপাশি ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি। এসব বক্তব্যের পক্ষে তিনি কোনো প্রস্তাবিত ব্যবস্থার নির্দিষ্ট কাঠামো বা বিএনপির আনুষ্ঠানিক নথি তুলে ধরেননি।
হাসনাত বলেন, জনগণ যে বিষয়ে রায় দিয়েছে, আগে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর মতে, প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের প্রতি আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ব্যাংক খাত ও ঋণ বিতরণ নিয়েও আপত্তির কথা জানান হাসনাত। তিনি বলেন, রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বৈঠকে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থ বিতরণ করা হলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং বিএনপিঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা পেতে পারে। এ বক্তব্যও তিনি আশঙ্কা হিসেবে তুলে ধরেন।
ব্যাংক খাতের আইন সংশোধনের প্রসঙ্গে তিনি ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে সরকার ওই ধারা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অবস্থান তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয় বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত। একই সঙ্গে ঋণখেলাপিরা যাতে নতুন করে ঋণ নেওয়ার সুযোগ না পান, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকের পর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাইফুল আলম মিলন বলেন, বিরোধীদলের প্রস্তাবগুলো অর্থমন্ত্রী তথা সরকার ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। জুলাই সনদে সরকারের অবস্থান এবং নোট অব ডিসেন্টসহ বিষয়গুলো সংসদে উপস্থাপনের কথাও বলেন তিনি।