আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সন্ত্রাসের অভিযোগে চলমান তদন্ত স্থবির হয়ে পড়েনি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি গাজী এম এইচ তামীম। তিনি বলেছেন, সারা দেশ থেকে দলটির কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং পর্যালোচনার কাজ চলছে। তবে একটি সংগঠন হিসেবে তদন্ত শেষ করতে সময় লাগবে।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গাজী এম এইচ তামীম এসব কথা বলেন। এক সাংবাদিক জানতে চান, সাবেক ও বর্তমান প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দল হিসেবে যে তদন্ত শুরু হয়েছে, সেটি বর্তমানে ‘কোল্ড স্টোরেজে’ চলে গেছে কি না। জবাবে তামীম বলেন, রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা সারা দেশ থেকে মামলার প্রত্যক্ষ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করছেন।
তদন্ত শেষ হতে সময় লাগার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত একটি বড় পরিসরের কাজ। দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং দলটির কার্যক্রম থাকা বিভিন্ন শাখা-উপশাখা থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। ফলে নির্দিষ্ট স্বল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা কঠিন।
গাজী এম এইচ তামীম বলেন, দেশের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে এ ধরনের বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার ঘটনা বিরল। সে কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা পর্যাপ্ত সময় নিয়ে কাজ করছেন। প্রসিকিউশনের সাহায্য ও পরামর্শে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত প্রতিবেদন কবে পাওয়া যাবে—এমন প্রশ্নের নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি তিনি। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, সারা দেশে অপরাধের কার্যক্রম সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তদন্তটি সময়সাপেক্ষ এবং এর জন্য সময় লাগবে।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। এ জন্য একজন তদন্ত কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলামও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দল হিসেবে তদন্ত চলার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত ও বিচার করার আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে কি না, তা তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিষয়টিও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। প্রজ্ঞাপনে প্রকাশনা, গণমাধ্যম ও অনলাইনে প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ ও সম্মেলনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়।
সরকারের ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান। একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দল হিসেবে তদন্ত শুরুর আগে ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, দলটির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে আনুষ্ঠানিক তদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর দুই দিন পরই তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর কথা জানানো হয়।
এদিকে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলন ঘিরে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক পৃথক মামলার বিচার ও তদন্ত চলছে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে চলমান মামলার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি আলাদা প্রক্রিয়া হিসেবে এগোচ্ছে।
প্রসিকিউশন সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগের তুলনায় একটি রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে তদন্তের পরিধি অনেক বিস্তৃত। সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বের ভূমিকা, মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের প্রয়োজন হওয়ায় তদন্তে সময় বেশি লাগছে।
তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী হবে বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়। তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াতেই অভিযোগের সত্যতা ও আইনগত পরিণতি নির্ধারিত হবে।