কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে কুমিল্লা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ৬ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মমিনুল হকের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি। পরে তাঁকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কুমিল্লা আদালত পুলিশের পরিদর্শক সাদেকুর রহমান জানান, সুমন হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে শনিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ জানায়, গত বুধবার রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকা থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাজমিনকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় তোলেন সুমন। পরে তাঁকে লালমাই উপজেলার একটি ফসলি জমির নির্জন এলাকায় নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর তাজমিনের মুঠোফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান সুমন। শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরের অলংকার এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদ এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তাজমিনের মুঠোফোন উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর বয়স নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৪ ও ১৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাবা আব্দুল আলিম একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। পরিবারটি নগরের রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমিন। ৭ অক্টোবর রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাঁকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়। একই রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠায় সে। বাবা ঘুমিয়ে থাকায় তখন বার্তাটি দেখতে পাননি। পরদিন সকালে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় পরে শনাক্ত হয়।

এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুকের মাধ্যমে রাজু চৌধুরী (২০) নামে কক্সবাজারে কর্মরত এক যুবকের সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় হয়েছিল। তাঁদের পরিচয় ও সম্পর্কের সময়কাল ছিল প্রায় ১৭ দিন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাজমিন কক্সবাজারে গিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যও ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ওই যুবকের বিরুদ্ধে তাজমিন হত্যায় জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তি অটোরিকশাচালক সুমন।
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল বৃহস্পতিবার বিকেলে। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মা তাকে বাসায় ফিরিয়ে আনতে চাইলেও বান্ধবীর নাম ও পরিবারের পরিচয় জানতে পারেননি।
মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকার কথা জানিয়েছেন তাজমিনের মা। তবে এসব ব্যক্তিগত বিষয় হত্যাকাণ্ডের দায় নির্ধারণ করে না। ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি ও অপরাধের দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে ৮ অক্টোবর লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। সুমনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এখন মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট আলামত যাচাই করা হবে।