বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা জানিয়েছে জাপানের টয়োটা তুশো করপোরেশন। আগামী বছর দেশের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকল (এইচইভি) উৎপাদন শিল্প স্থাপনের কাজ শুরু করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব বিভাগীয় পর্যায়ে টয়োটার বিতরণ ও সেবা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে টয়োটা তুশো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এসব পরিকল্পনার কথা জানায়। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের তথ্য জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশে টয়োটার কার্যক্রম সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়নের প্রসার, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অবদান রাখার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিনিধি দল জানায়, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে, বাংলাদেশের জন্য’ উন্নয়ন দর্শন সামনে রেখে ২০২৭ সালে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে টয়োটা বাংলাদেশের উদ্যোগে এইচইভি উৎপাদন শিল্প স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে সেখানে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ের প্রস্তুতি ও স্থাপনা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রায় দুই বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির এ উদ্যোগ দেশের অটোমোবাইল শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বর্তমানে দেশের গাড়ির বাজারে আমদানি করা সম্পূর্ণ তৈরি গাড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে সংযোজনের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে যন্ত্রাংশ, কারিগরি সেবা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পটির বিনিয়োগের পরিমাণ, কারখানার নির্দিষ্ট স্থান, উৎপাদন সক্ষমতা ও স্থানীয় উপাদান ব্যবহারের হার সম্পর্কে বৈঠকে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
টয়োটার বিনিয়োগের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা, অবকাঠামোগত সুবিধা ও অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। টয়োটা তুশো এসব খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি। এতে শুধু গাড়ি উৎপাদন নয়, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতেও জাপানি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
টয়োটা বাংলাদেশের বিতরণ নেটওয়ার্ক আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বর্তমানে যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, তা দেশের সব বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে বলে প্রতিনিধি দল জানায়। এর ফলে রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও টয়োটার গাড়ি, সেবা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্য রয়েছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নেও বিনিয়োগের আগ্রহ জানিয়েছে টয়োটা। বিশেষ করে তরুণদের জন্য কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ শিল্পের উপযোগী কর্মী গড়ে তোলার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা রয়েছে। গাড়ি উৎপাদনের পাশাপাশি এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে অটোমোবাইল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি খাতে স্থানীয় দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ বাড়বে।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। টয়োটা তুশো করপোরেশনের মোবিলিটি ডিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শিগেরু হারাদা, টয়োটা বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট প্রেমমিত সিংসহ প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠকে অংশ নেন।
বাংলাদেশে এইচইভি উৎপাদন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের অটোমোবাইল খাতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে পরিকল্পনা থেকে বাস্তব উৎপাদনে যেতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, দক্ষ জনবল, স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং বাজারের সক্ষমতা—সবকিছুর সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে। আপাতত টয়োটার ঘোষণায় সেই প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হিসেবে ২০২৭ সালে কাজ শুরুর বিষয়টি সামনে এসেছে।