চার দশকেরও বেশি সময় আগে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল ইরান। দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি চেয়েছিলেন ইরাকের শাসকগোষ্ঠীর অবসান ঘটাতে। সে সময় সাদ্দাম হোসেন ওয়াশিংটনের ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছিলেন।
ইরাকের সঙ্গে সেই যুদ্ধ আধুনিক ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। ওই সংঘাতে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের উত্তরসূরি ও তাঁদের মতাদর্শই এখনো তেহরানের ক্ষমতার কাঠামোয় প্রভাবশালী। দীর্ঘ ওই যুদ্ধের সময় ইরানের অবস্থান ছিল অনেকটা এমন—কে কতটা ক্ষমতাশালী, সেটি বড় বিষয় নয়; যে পক্ষ সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে, শেষ পর্যন্ত তারাই জয়ী হবে।
সেই যুদ্ধের পর চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। গত ছয় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতেও তেহরানের অবস্থান অনেকটা একই রকম বলে বিশ্লেষণ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরানের ভেতরেই মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক পক্ষ বর্তমান অবস্থান থেকেই বিজয় ঘোষণা করে সংঘাতের অবসান চায়। অন্য পক্ষ সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত করার পক্ষে।
বিজয় ঘোষণা করে সংঘাতের অবসানের পক্ষে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন কট্টরপন্থীরা।
মধ্যপন্থীরা প্রকাশ্যেই সতর্ক করেছেন, সংঘাত নিরসনের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চলতি মাসে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘যুদ্ধ একটা সময়ে শেষ হতে হবে। এটি আজ শেষ হওয়াই ভালো, যখন আমরা দৃঢ়তা ও সম্মানের অবস্থানে রয়েছি এবং পুরো বিশ্ব আমাদের বিজয় স্বীকার করে নিচ্ছে।’
তবে কট্টরপন্থীদের অবস্থান ভিন্ন। তাঁদের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন ইরানকে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়েই এগিয়েছে। ফলে তাঁরা কোনো ধরনের আপসে যেতে রাজি নন। বরং সরকারের কর্মকর্তাদের ‘পশ্চিমঘেঁষা’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের সমালোচনা করছেন এবং জনমত নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
লন্ডনের থিঙ্কট্যাঙ্ক চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য একটি সত্তা হিসেবে দেখে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাদের মনোভাব হলো, যুদ্ধে না হারার অর্থ তারা জিতেছে।’
কট্টরপন্থীরা পেজেশকিয়ানকে একজন দুর্বল প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেন। তাঁদের মতে, তাঁর পূর্বসূরি বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর অনেকটা আকস্মিকভাবেই পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্টের পদে এসেছেন।
গত জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়েও কট্টরপন্থীদের আপত্তি রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকারের কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থনৈতিক সংকটকে ভুলভাবে পরিচালনা করে জনগণকে ওই চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করছেন। কেউ কেউ আরও অভিযোগ করেছেন, সরকার জ্বালানি সংকট তৈরি করে সমঝোতাকে অনিবার্য করে তুলছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যও ইরানের মধ্যপন্থীদের আরও চাপে ফেলছে। কখনো তিনি বলছেন, ইরানকে তিনি ‘মহান’ করে তুলবেন। আবার পরক্ষণেই ইরানকে বোমা মেরে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছেন। সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ইরানের ভেতরের অস্থিরতা আরও বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, এসবের মধ্যে নীরব রয়েছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তাঁর অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে, অনির্ভরযোগ্য ট্রাম্পের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি এখনই ইরানের কোনো একটি পক্ষকে বেছে নিতে চাইছেন না।
তবে সম্প্রতি মুসলিম বিশ্বের প্রতি, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি ‘আসল শত্রুর’ বিরুদ্ধে একত্র হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মোজতবা খামেনি। তিনি বলেছেন, মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি শত্রুদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেওয়া এক লিখিত বার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন। তাঁর বার্তাটি ইসলামিক ইউনিটি উইক টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়েছে।
বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, যারা ‘জেনে বা না জেনে’ মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করছে, তারা ইসলামের শত্রুদের সহায়তা করছে। মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য থাকলে ফিলিস্তিনিরা ‘এত অসহায়’ অবস্থায় থাকত কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আহত হওয়ার পর গত ছয় মাস ধরে প্রকাশ্যে আসেননি মোজতবা খামেনি। তাঁর বাবা ও পরিবারের ওপর হওয়া হামলার মধ্য দিয়েই ইরান যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত শুক্রবার একই ধরনের একটি বিবৃতি তিনি ইরানিদের উদ্দেশেও দিয়েছেন।
এদিকে ইরানকে ঘিরে সংঘাত আরও বিপজ্জনক দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সন্ত্রাসবিরোধী উপদেষ্টা জো কেন্ট। তাঁর আশঙ্কা, অচলাবস্থা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেন্ট বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যখন সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, তখন বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটবে না ভাবলে বোকামি হবে। তাঁর মতে, পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
জো কেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের সাবেক পরিচালক। এর আগে তিনি স্পেশাল ফোর্সেস ও সিআইএতেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
গত এপ্রিলে ট্রাম্প ইরানে পারমাণবিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ওয়াশিংটনের দাবি মেনে না নিলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’।
কেন্টের মতে, ওয়াশিংটন যদি আগের অবস্থানে ফিরে গিয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন এবং দেশটির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চায়, তাহলে ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকবে। একটি হলো স্থল অভিযান, আর অন্যটি পারমাণবিক হামলা।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তিও এখন তেহরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। একদিকে সংঘাতের অবসান চাওয়া মধ্যপন্থীরা সময়ের চাপের কথা বলছেন, অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা দীর্ঘ লড়াইয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এর মধ্যে ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।