বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মঙ্গলবার ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করতে যাচ্ছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে দলটি প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে দলের রাজনৈতিক অবস্থান, কর্মসূচি ও নীতিতে পরিবর্তন এলেও প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল জিয়াউর রহমান তাঁর সরকারের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকনির্দেশনা হিসেবে ১৯ দফা ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এই কর্মসূচি দলের রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়। আত্মনির্ভরতা, জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ, মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—১৯ দফার বিভিন্ন কর্মসূচিতে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯ দফার অনেক বিষয় সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ব্যাখ্যা পেলেও রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রে এর বেশ কিছু লক্ষ্য এখনো প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ বিকাশ, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়গুলো বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯ দফার প্রথম দফায় দেশের সার্বভৌমত্ব যেকোনো মূল্যে রক্ষার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে চারটি মূলনীতির কথা তুলে ধরা হয়—সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব নীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দিকনির্দেশনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় প্রশাসনের সব স্তরে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আত্মনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ধারণাও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
১৯ দফায় ধর্ম, বর্ণ ও মতাদর্শের পার্থক্য নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিএনপির নেতারা দীর্ঘদিন ধরে এই অংশকে দলের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করে আসছেন।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে কৃষির উন্নয়নকে ১৯ দফায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি ১৯ দফায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। নদী, খাল ও নিম্নভূমির যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যা ও খরার ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ধারণা তখনকার উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
শিল্পায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টিও ১৯ দফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। দেশের অর্থনীতিকে কৃষিনির্ভরতার পাশাপাশি শিল্পভিত্তিক করার জন্য শিল্প খাতের বিকাশ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণকেও ১৯ দফায় রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
গ্রামীণ উন্নয়ন ছিল ১৯ দফার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টিও যুক্ত ছিল।
পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও ১৯ দফায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সীমিত সম্পদের ওপর চাপ কমানো এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে এ নীতিকে যুক্ত করা হয়েছিল।
দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শ্রমিকের অধিকার, সিভিল সার্ভিস সংস্কার, ভূমি সংস্কার এবং যুবসমাজের ক্ষমতায়নের মতো বিষয়ও ১৯ দফায় স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় করার জন্য প্রণোদনার কথা বলা হয়।
নারীর অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিও ১৯ দফায় গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নয়নের মূলধারায় নারীদের সম্পৃক্ত করা এবং তাঁদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা এতে উল্লেখ করা হয়।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ১৯ দফায় কিছু নীতিগত অবস্থান তুলে ধরা হয়। সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথাও বলা হয়।
১৯ দফা ঘোষণার সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল বর্তমান সময়ের তুলনায় ভিন্ন। তখন যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, বেকারত্ব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতায় আত্মনির্ভরতা, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে সামনে রেখে কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১৯ দফা বিভিন্ন সময় নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দলটির নেতারা মনে করেন, সময় বদলালেও জনগণের মৌলিক চাহিদা, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন, জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের মতো বিষয়গুলোর গুরুত্ব কমেনি। এ কারণে ১৯ দফা এখনো দলের রাজনৈতিক পথনির্দেশক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি কয়েকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও রাজনীতি করেছে। সামরিক শাসনের অবসান, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, নির্বাচন, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্ষমতার পালাবদলের নানা অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে দলটির রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে।
দলটির নেতারা মনে করেন, প্রতিষ্ঠার সময় যে আত্মনির্ভর ও জনসম্পৃক্ত বাংলাদেশের ধারণা সামনে রাখা হয়েছিল, বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় তার নতুন প্রয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় কার্যকর করতে হলে এর মূলনীতিগুলোর পাশাপাশি সময়োপযোগী নীতিরও প্রয়োজন রয়েছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। ফলে পুরোনো নীতিকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিএনপির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই দলটির সামনে শুধু অতীতের রাজনৈতিক ঐতিহ্য স্মরণ করার বিষয় নয়, বরং প্রতিষ্ঠাকালীন ১৯ দফার মূল লক্ষ্যগুলোকে বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে—সেটিও আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে।
১৯৭৭ সালে ঘোষিত ১৯ দফা থেকে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ—সময়ের ব্যবধান প্রায় পাঁচ দশক। এই দীর্ঘ সময়ে দেশ যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির কাঠামো। তারপরও জাতীয় ঐক্য, আত্মনির্ভরতা, গণতন্ত্র, গ্রামীণ উন্নয়ন, মানবসম্পদ ও মৌলিক অধিকার—১৯ দফার এসব বিষয় বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে এখনো গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারই নতুন করে সামনে আনছে দলটি।