বিশ্বের বাণিজ্যিক বিমান পরিবহন খাতে উড়োজাহাজের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দিচ্ছে একের পর এক দেশ। বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশের বিমান সংস্থাগুলো বহর আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদা মোকাবিলায় বোয়িংয়ের নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ বেছে নিচ্ছে। একই সময়ে চীনা বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বড় আকারের বোয়িং ক্রয়াদেশ চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক এসব চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিতে বোয়িংয়ের অর্ডার বই যেমন শক্তিশালী হচ্ছে, তেমনি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক বিমানবাজারে বোয়িং ও ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের প্রতিযোগিতাও নতুন করে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের বহরে আরও ১১ বোয়িং
সাম্প্রতিক এই প্রবণতায় বাংলাদেশও রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। নতুন চুক্তিতে রয়েছে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮। এর ফলে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের এ বছর করা মোট অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে।
নতুন চুক্তিটি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় সম্পন্ন হয়েছে। বোয়িং জানিয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে। বিমানের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন বলেছেন, জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা হিসেবে যাত্রী, প্রবাসী বাংলাদেশি, ব্যবসা ও পর্যটনের যোগাযোগের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বহর ও নেটওয়ার্ক উন্নয়নের লক্ষ্যেই এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে চলতি বছর বিমান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছিল। ওই চুক্তিতে ড্রিমলাইনার ও বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স পরিবারের উড়োজাহাজ রয়েছে। নতুন ১১টি যুক্ত হওয়ায় বিমানের বোয়িংভিত্তিক বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আরও বড় হলো।
তবে বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা শুধু বোয়িংকেন্দ্রিক নয়। ইউরোপের এয়ারবাসও বাংলাদেশের বাজারে সক্রিয় রয়েছে। সরকার-নিযুক্ত কারিগরি কমিটি এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবও পর্যালোচনা করছে। ফলে বিমানের ভবিষ্যৎ বহর কেমন হবে, সেখানে দুই নির্মাতার প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তুরস্কের ১৫০, তবে সবই এখনই নিশ্চিত নয়
বোয়িংয়ের সাম্প্রতিক বড় ক্রয়াদেশগুলোর একটি এসেছে তুরস্ক থেকে। তুর্কিশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স পরিবারের সর্বোচ্চ ১৫০টি উড়োজাহাজ নেওয়ার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এর মধ্যে ১০০টি ৭৩৭-৮ নিশ্চিত ক্রয়াদেশ এবং আরও ৫০টির জন্য অপশন রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ১৫০টি পুরোপুরি নিশ্চিত অর্ডার নয়; ৫০টি পরবর্তী সময়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে রয়েছে।
চুক্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী ৭৩৭-১০ মডেলে কিছু উড়োজাহাজ পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছে। উড়োজাহাজগুলো মূলত তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের রুটে বহর সম্প্রসারণে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এই চুক্তির আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সাল থেকে বোয়িং ও তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের মধ্যে এ ক্রয়াদেশ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের শর্ত নিয়ে জটিলতার কারণে চুক্তি চূড়ান্ত হতে সময় লাগে। শেষ পর্যন্ত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ বড় উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত শুধু বিমান কেনার মূল্য বা যাত্রী চাহিদার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও এ ধরনের চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চীনের ২০০ উড়োজাহাজের সমীকরণ
চীনের বাজার বোয়িংয়ের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, চীনা বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বোয়িংয়ের প্রায় ২০০টি উড়োজাহাজের ক্রয়প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ১৪০টি চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে এবং আরও কয়েকটি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ নিয়ে কাজ চলছে।
চীনের এই সম্ভাব্য ক্রয়াদেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বও রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যেই বিমান কেনার এই আলোচনা চলছে।
বোয়িংয়ের জন্য চীনা বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বিমান পরিবহন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ বাজার হিসেবে চীন দীর্ঘদিন ধরে বোয়িং ও এয়ারবাসের প্রধান গ্রাহকদের একটি।
তবে চীনের ক্রয়াদেশের পুরো পরিমাণকে নিশ্চিত অর্ডার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বোয়িংয়ের প্রধান নির্বাহী কেলি অর্টবার্গও বড় কোনো নতুন ঘোষণার বিষয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে চীনা বাজারে সম্ভাব্য অর্ডার এবং নিশ্চিত ক্রয়াদেশ—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
এয়ার ইন্ডিয়ার বহরেও বড় পরিবর্তন
ভারতের এয়ার ইন্ডিয়াও বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন উড়োজাহাজ নেওয়ার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। সংস্থাটি ৩০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০টি ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ এবং ১০টি ৭৩৭ ম্যাক্স ১০। এর ফলে বোয়িংয়ের কাছে এয়ার ইন্ডিয়ার মোট অর্ডারের সংখ্যা ২৫০টিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি এয়ারবাসের কাছেও এয়ার ইন্ডিয়ার বড় ক্রয়াদেশ রয়েছে।
এয়ারবাসের আগের অর্ডারের একটি অংশ পরিবর্তন করে ১৫টি এ৩২১এক্সএলআর নেওয়ার সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। এ৩২১এক্সএলআর একক-আইল উড়োজাহাজের মধ্যে দীর্ঘতম দূরত্বে চলাচলের সক্ষমতাসম্পন্ন মডেলগুলোর একটি। ফলে এয়ার ইন্ডিয়া ভবিষ্যতে তুলনামূলক কম চাহিদার দীর্ঘপাল্লার রুটেও সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ বাড়াতে পারে।
২০২২ সালে টাটা গ্রুপ এয়ার ইন্ডিয়ার মালিকানা নেওয়ার পর থেকেই বিমান সংস্থাটির বহর পুনর্গঠনের বড় পরিকল্পনা শুরু হয়। ২০২৩ সালে এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের কাছ থেকে শত শত উড়োজাহাজের অর্ডার সেই পরিকল্পনারই অংশ।
ফিলিপাইনেও ড্রিমলাইনার
এশিয়ার আরেকটি বড় উদাহরণ ফিলিপাইন এয়ারলাইন্স। জুলাইয়ে সংস্থাটি বোয়িংয়ের সঙ্গে ৭৮৭ ড্রিমলাইনার কেনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে। পরিকল্পনায় রয়েছে ১৫টি ৭৮৭-১০ এবং আরও পাঁচটি উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ—অর্থাৎ মোট ২০টি পর্যন্ত উড়োজাহাজ।
নতুন উড়োজাহাজগুলো ফিলিপাইন এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় দুই দশক পর সংস্থাটি বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন উড়োজাহাজ নেওয়ার দিকে যাচ্ছে।
৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার তুলনামূলক বেশি যাত্রী বহন করতে সক্ষম এবং দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনার জন্য তৈরি। ফলে এ ধরনের উড়োজাহাজ দিয়ে ফিলিপাইন এয়ারলাইন্সের দীর্ঘপাল্লার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কেন বাড়ছে নতুন উড়োজাহাজের চাহিদা?
সাম্প্রতিক ক্রয়াদেশগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বড় প্রবণতা স্পষ্ট হয়—বিশ্বের বিমান সংস্থাগুলো পুরোনো বহর বদলে নতুন প্রজন্মের জ্বালানিসাশ্রয়ী উড়োজাহাজে যেতে চাইছে। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বিমানযাত্রায় যাত্রীসংখ্যা বাড়ার প্রত্যাশা। দ্বিতীয়ত, পুরোনো উড়োজাহাজ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়। তৃতীয়ত, জ্বালানি সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ। চতুর্থত, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় বহর তৈরি করা।
বিশেষ করে ৭৩৭ ম্যাক্স ও ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মতো নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেও বিমান সংস্থাগুলোর কাছে আকর্ষণীয়। তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের মতো বড় ক্যারিয়ার স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ৭৩৭ ম্যাক্স ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে চাইছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মতো দেশ দীর্ঘপাল্লার রুটের জন্য ড্রিমলাইনারের দিকে নজর দিচ্ছে।
বোয়িং-এয়ারবাস প্রতিযোগিতাও তীব্র
বোয়িংয়ের অর্ডার বাড়লেও এর অর্থ এই নয় যে বৈশ্বিক বাজারে এয়ারবাস পিছিয়ে পড়ছে। বরং বিশ্বের বড় বিমান সংস্থাগুলোর অধিকাংশই দুই নির্মাতার কাছ থেকেই বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ নিচ্ছে। এয়ার ইন্ডিয়ার বহর তার বড় উদাহরণ। সেখানে বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের উড়োজাহাজও রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজের পরিকল্পনার পাশাপাশি এয়ারবাসের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। অর্থাৎ বিমান সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তে শুধু নির্মাতার ব্র্যান্ড নয়—উড়োজাহাজের ধরন, আসনসংখ্যা, পাল্লা, জ্বালানি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ রুট পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন এখন বহর নয়, ব্যবহার
বিমানের জন্য ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজের পরিকল্পনা বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে বড় বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ। তবে এর অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে উড়োজাহাজগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। নতুন উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি কোন রুটে এগুলো চালানো হবে, কতটা যাত্রী পাওয়া যাবে, আন্তর্জাতিক স্লট ও রুট অধিকার কীভাবে ব্যবহৃত হবে, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো কতটা শক্তিশালী করা হবে এবং বিমান কীভাবে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি আধুনিক উড়োজাহাজ নিজে কোনো বিমান সংস্থার লাভ নিশ্চিত করে না। সেটিকে পর্যাপ্ত সময় আকাশে রাখা, উপযুক্ত রুটে পরিচালনা করা এবং যাত্রী ও কার্গো চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করাই মূল বিষয়।
বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের সাম্প্রতিক ক্রয়াদেশগুলো তাই শুধু একটি কোম্পানির বিক্রি বাড়ার খবর নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিমান পরিবহনের ভবিষ্যৎ চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, জ্বালানি দক্ষতা এবং দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ কৌশল। বাংলাদেশের ২৫টি বোয়িং কেনার পরিকল্পনাও সেই বৈশ্বিক পরিবর্তনের অংশ—যার প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নতুন বহর কতটা কার্যকরভাবে বাংলাদেশের আকাশপথের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে তার ওপর।