মামদানির বিরুদ্ধে হামাস-সমর্থনের অভিযোগ; ভাষণের শুরুতেই জাতিসংঘ কক্ষ ছাড়লেন বহু প্রতিনিধি
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েল ও দেশটির সেনাবাহিনীকে নিয়ে যারা ‘মিথ্যা’ তথ্য ছড়াচ্ছেন, তারা জাতিসংঘের অধিবেশন কক্ষে থাকুন কিংবা নিউইয়র্কের মেয়রের কার্যালয়ে থাকুন—তাদের ‘লজ্জিত’ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মামদানিকে উদ্দেশ করে নেতানিয়াহু এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর বক্তব্য শুরুর সময় বহু দেশের প্রতিনিধি অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
মামদানিকে উদ্দেশ করে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে শহরের অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে বসবাসকারী কিছু ইহুদি তার সঙ্গে কথা বলে শহরের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এরপর মামদানির বিরুদ্ধে হামাসের যোদ্ধাদের সমর্থনের অভিযোগ তোলেন নেতানিয়াহু। তবে মামদানি প্রকাশ্যে হামাসকে সমর্থন করেছেন—নেতানিয়াহুর এই অভিযোগের পক্ষে তাঁর ভাষণে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের প্রচারের সময় মামদানি বলেছিলেন, নেতানিয়াহু যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত অবস্থায় নিউইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করবেন। পরে মামদানি জানান, বিষয়টি নিয়ে নিউইয়র্কের আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্যালোচনার পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার স্বাধীন আইনি ক্ষমতা নিউইয়র্ক সিটির নেই। তিনি এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান জানান।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। আইসিসির অভিযোগের মধ্যে গাজায় বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে কথিত অপরাধ এবং মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার বিষয় রয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য আইসিসির এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের ভাষণে ইরান প্রসঙ্গও বড় জায়গা পায়। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েল পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা কঠিন ছিল বলে স্বীকার করলেও তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য ‘সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্তগুলোর একটি’ ছিল।
নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরায়েল ওই পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনত। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেরও পুনরাবৃত্তি করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে ‘গুঁড়িয়ে দিয়েছে’। সাম্প্রতিক সংঘাতের বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল শুধু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নয়, অন্য দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্যও পদক্ষেপ নিয়েছে।
ইসরায়েল বর্তমানে ‘সাতটি ফ্রন্টে’ লড়াই করছে বলেও দাবি করেন নেতানিয়াহু। হামাস, হিজবুল্লাহ, হুথি, ইরান এবং ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে থাকা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশংসাও করেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইসরায়েলের ‘ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো অংশীদার ছিল না’। দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
এদিকে নেতানিয়াহু ভাষণ শুরু করার আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কক্ষ থেকে বহু দেশের প্রতিনিধি বেরিয়ে যান। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে বিরোধিতার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবে সামনে আসে। আল-জাজিরার ভিডিও প্রতিবেদনেও বহু প্রতিনিধিকে কক্ষ ত্যাগ করতে দেখা যায়।
প্রতিনিধিদের এই ওয়াকআউটের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু তাদের সমালোচনা করেন। তিনি কক্ষ ছেড়ে যাওয়া প্রতিনিধিদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি করেন, তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও ইরানের হুমকি থেকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ইসরায়েলের ভূমিকা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর এবারের জাতিসংঘ ভাষণ মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে—ইসরায়েলের গাজা ও আঞ্চলিক সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে নিরাপত্তাগত প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করা এবং আন্তর্জাতিক সমালোচকদের জবাব দেওয়া। একই সঙ্গে নিউইয়র্কের মেয়র মামদানির সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য বিরোধও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে সামনে এসেছে।