- জেল কোডের ৫৬৯ বিধিতে আবেদন করেও আগাম মুক্তি না পাওয়ার অভিযোগ; নতুন জীবনে ফেরাতে জেলা প্রশাসনের ব্যাটারিচালিত ভ্যান
২৩ বছর ৯ মাস পর কারাগারের চার দেয়াল পেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে ফিরেছেন রাজশাহীর মিঠু মিয়া। দীর্ঘ এই বন্দিজীবনের পর বাইরে এসে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তবে মুক্তির আনন্দের সঙ্গে রয়ে গেছে দীর্ঘদিনের একটি আক্ষেপ—জেল কোডের ৫৬৯ বিধিতে আবেদন করেও তিনি সময়মতো আগাম মুক্তির সুযোগ পাননি বলে দাবি তাঁর। তাঁর ভাষ্য, আবেদনটি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হলে প্রায় চার বছর আগেই কারাগার থেকে বের হতে পারতেন।
দীর্ঘ কারাভোগ শেষে মিঠু মিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জীবিকা নির্বাহের। কারাগার থেকে মুক্তির আগে এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলেন তিনি। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক ভ্যান দেওয়া হয়েছে। এর মূল্য প্রায় ৭৫ হাজার টাকা।
গত ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে রাজশাহীর পবা উপজেলা চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যানটি মিঠু মিয়ার হাতে তুলে দেন। মিঠুর আশা, এই ভ্যান চালিয়ে আয়-রোজগার করে এবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন তিনি।
কারাগারে কাটানো দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি জানতে চাইলে মিঠু মিয়া বলেন, বছরের পর বছর তিনি কারাগারের রান্নার কাজে যুক্ত ছিলেন। দায়িত্ব পালন এবং ভালো আচরণ করেও প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাননি বলে তাঁর অভিযোগ। তাঁর ভাষ্য, কারাগারে বন্দিদের আচরণ, শৃঙ্খলা ও দীর্ঘদিনের সাজাভোগ বিবেচনায় আগাম মুক্তির যে সুযোগ রয়েছে, তা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয় না। মিঠু বলেন, তিনি জেল কোডের ৫৬৯ বিধিতে আবেদন করেছিলেন। তাঁর দাবি, আবেদনটি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হলে চার বছর আগেই মুক্তি পেতে পারতেন। দীর্ঘ সময় কারাভোগের পরও আগাম মুক্তির সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
জেল কোডের ৫৬৯ বিধি দীর্ঘমেয়াদি ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের আগাম মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। এটি সাধারণভাবে ‘বিশ বছরের বিধি’ নামে পরিচিত। বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় কারাভোগ এবং মওকুফসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা বন্দিদের মামলা সরকারের বিবেচনার জন্য পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বন্দির কারাগারে আচরণ, শৃঙ্খলা, সাজাভোগের সময়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
সাম্প্রতিক সময়েও এই বিধানের আওতায় দীর্ঘদিন সাজাভোগকারী বন্দিদের মুক্তি দিয়েছে সরকার। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ২০ বছরের বেশি সময় কারাভোগ করা ৫৬ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই বছরের নভেম্বরে আরও ৩৭ জন দীর্ঘমেয়াদি ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দির অবশিষ্ট সাজা মওকুফ করে মুক্তির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এসব ক্ষেত্রে বন্দিদের বয়স, কারাগারে আচরণ, মামলার ধরন ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৫৬৯ বিধির আওতায় কোনো বন্দির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময় কারাভোগ ও মওকুফের হিসাব পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট মামলা সরকারের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। তবে এই বিধির আওতায় আগাম মুক্তি স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়; সরকারের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তা কার্যকর হয়।
মিঠু মিয়ার আক্ষেপের জায়গাটি এখানেই। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পরও তাঁর আবেদন কার্যকরভাবে বিবেচনা করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের মুক্তি পেলেও ৫৬৯ বিধিতে আবেদন করা অনেক বন্দির ক্ষেত্রে একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যায় না বলে তিনি মনে করেন।
তবে তাঁর এই দাবির প্রশাসনিক নথিপত্র, আবেদনটি কখন করা হয়েছিল, কারা কর্তৃপক্ষ থেকে তা সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল কি না এবং কেন তা অনুমোদিত হয়নি—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। ফলে ‘চার বছর আগে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল’—মিঠুর এই বক্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
২৩ বছর ৯ মাসের বন্দিজীবন শেষে এখন অতীতের হিসাবের চেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি ভাবতে চান মিঠু। জেলা প্রশাসনের দেওয়া ভ্যানটি তাঁর কাছে শুধু একটি যানবাহন নয়, দীর্ঘ বন্দিজীবনের পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার একটি সুযোগ। তিনি চান, ভ্যানটি চালিয়ে নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতে। দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর সমাজে ফিরে নতুনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাই এখন তাঁর লক্ষ্য।
সাক্ষাতের শেষ সময়ে মিঠু বারবার তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরার অনুরোধ করেন। তাঁর বক্তব্য, একজন বন্দির যে অধিকার বা প্রাপ্য, তা যেন নিয়ম অনুযায়ী নিশ্চিত করা হয়। বিশেষ করে সাজা মওকুফ বা আগাম মুক্তির আবেদন যাতে যথাযথভাবে যাচাই ও বিবেচনা করা হয়, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।
দীর্ঘ ২৩ বছর ৯ মাস পর কারাগারের দরজা পেরিয়ে মিঠু মিয়া যখন বাইরে এলেন, তখন তাঁর সামনে একদিকে হারিয়ে যাওয়া জীবনের দীর্ঘ স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন করে পথচলার সুযোগ। ৭৫ হাজার টাকার ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি সেই নতুন পথচলার প্রথম সম্বল। এখন তাঁর প্রত্যাশা—এবারের জীবনটা যেন নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারেন।