সংঘর্ষে আহত ২১৫ শিক্ষার্থী, ৭১৫ পুলিশ সদস্য; গ্রেপ্তার ৬১০০ — আন্দোলনকে ‘ইসলাম ও অভিবাসনের’ সঙ্গে জড়ালেন ট্রাম্প
শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থায়ন বাড়ানো, শিক্ষক সংকট দূর করা এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। ফরাসি সরকারের হিসাবে, এদিন দেশজুড়ে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ রাস্তায় নামেন। আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের আশপাশে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলে শিক্ষক ও কর্মীর ঘাটতি, ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা, দীর্ঘ ক্লাসের সময় এবং শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থ না দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলেও বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মঙ্গলবার প্যারিস, লিওঁ, নঁত, মার্সেই, তুলুজ ও স্ট্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীরা রাস্তার বিভিন্ন বস্তুতে আগুন দেন, পুলিশের দিকে বস্তু নিক্ষেপ করেন এবং দোকান ও স্থাপনায় ভাঙচুর চালান। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে। প্যারিসে একটি ছোট দলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চললেও শহরের অন্য অনেক এলাকায় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল।
আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠনের হিসাবে, প্রায় ২ হাজার উচ্চবিদ্যালয় অবরোধ বা বন্ধের মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সংগঠনগুলো স্কুলের অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করছে।
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। ফরাসি সরকারের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ২১৫ শিক্ষার্থী, ৮৫ জন স্কুলকর্মী এবং ৭১৫ পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় উত্তর ফ্রান্সে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে প্রায় ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন অভিযোগে ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা চলছে; তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে কাজ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে দ্রুত বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ, স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা, মধ্যাহ্নভোজের বিরতি বাড়ানো এবং পুরোনো স্কুল ভবন সংস্কার। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এসব বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা সহজ নয়। দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ সরকারি ঋণ এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। ফলে শিক্ষায় ব্যয় বাড়ানোর দাবি একদিকে সামাজিক চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্নও সামনে আনছে।
মুসলিমরা ফ্রান্স দখলের চেষ্টা করছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে ট্রাম্প
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ফ্রান্সে যা হচ্ছে তা ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যাপক অভিবাসনের থেকে কম কিছু নয়। এটি কোনো স্কুলের বিষয় নয় (শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়), এটি ইসলামের বিষয়, যা এক সময়ের গ্রেট দেশ ফ্রান্স দখলের চেষ্টা করছে।’
তবে ফরাসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ঘোষিত দাবিগুলো শিক্ষা ব্যবস্থাকেন্দ্রিক। শিক্ষক সংকট, স্কুল ভবনের দুরবস্থা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষা খাতে অর্থায়ন এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন পরিবেশ উন্নত করার দাবিতেই আন্দোলনটি শুরু হয়েছে। এসব দাবির সঙ্গে অভিবাসন বা ধর্মীয় ইস্যুকে আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে যুক্ত করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফ্রান্সে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। শিক্ষা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ইতোমধ্যে অর্থনীতি, সরকারি ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের দাবির সমাধানের পাশাপাশি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়াও ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।