ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভে যোগ দিতে এসে আটক হওয়ার পর ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তিন শীর্ষ নেতার অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে দলটি। নেতাদের কোথায় রাখা হয়েছে, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আটকের বিষয়ে জানানো হয়েছে কি না এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিজেপি। অন্যদিকে, পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্তি পেয়েছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এইসা) সভাপতি নেহা বোরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর ভেতর থেকেই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের নেতা সৌরভ দাশ ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়। তাঁরা দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নিতে এসেছিলেন। তাঁদের আটকের বিষয়টি পুলিশ কর্মকর্তাদের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। তবে আটকের পর তাঁদের কোথায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছে, আটকের পর থেকে তিন নেতার অবস্থান সম্পর্কে তারা কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছে না। তাঁদের পৃথক স্থানে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের আটকের বিষয়ে জানানো হয়নি এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তিন নেতাকে কোথায় রাখা হয়েছে, তাঁদের আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না এবং আটকের আইনগত ভিত্তি কী—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মুক্তি পেলেন নেহা বোরা
সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন এইসার সভাপতি নেহা বোরা। পরে তিনি পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, পুলিশ তাঁর ফোন নিয়ে নিয়েছিল। পরে সেটি ফেরত পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ময়দান গড়ি থানায় আটক নারীদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পোস্টে জানানো হয়। তবে মুক্তি পাওয়া নারীদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এবং তাঁদের আটকের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার দিল্লিতে সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে বিভিন্ন স্থানে ধরপাকড় চলে। বিমানবন্দরে তিন নেতাকে আটকের পাশাপাশি আন্দোলনে যোগ দিতে আসা ছাত্রনেতা, আইনজীবী, রাজনৈতিক কর্মী ও অন্যদেরও আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের দেওয়া আটকের সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে মোট কতজনকে আটক করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। দলটির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে এবং এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সংশোধন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ভোটারের যোগ্যতা যাচাই বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে; রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগও কমিশন অস্বীকার করেছে।
দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়ায় বিক্ষোভের আগে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো, চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং আগাম আটকসহ নানা পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়। বিক্ষোভস্থলের আশপাশে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার নির্দেশসহ জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো। এসব পদক্ষেপের ফলে রাজধানীর স্বাভাবিক চলাচলেও প্রভাব পড়ে।
পুলিশের পদক্ষেপের নিন্দা অ্যামনেস্টির
দিল্লিতে বিক্ষোভের আগে আরোপিত বিধিনিষেধ ও আন্দোলনকারীদের আটকের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বোর্ডের চেয়ারম্যান আকার প্যাটেল বলেন, ক্ষমতাসীনদের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার কারণে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ভয়ভীতি, নির্বিচার আটক কিংবা ব্যাপক বিধিনিষেধের মুখে পড়া উচিত নয়। বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া, দিল্লিগামী ট্রেন চলাচলে বাধা, রাজধানীর প্রবেশপথে নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ এবং আগাম আটকের মতো পদক্ষেপের সমালোচনা করেন তিনি।
বিবৃতিতে আকার প্যাটেল বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ভারতের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত। কর্তৃপক্ষের প্রতি এসব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। এর মধ্যে সিজেপির তিন নেতার অবস্থান নিয়ে দলের অভিযোগ এবং নেহা বোরার মুক্তির ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে আটক নেতাদের বর্তমান অবস্থান, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে কি না এবং কখন তাঁদের মুক্তি দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।