সিইসির পদত্যাগ ও ভোটার তালিকা সংশোধন বন্ধের দাবিতে বিরোধীদের পদযাত্রার ঘোষণা
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বন্ধ এবং কথিত নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। একদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’ সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রা করে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। টানা বিক্ষোভ ও ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সমাবেশ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিরোধী জোটের নেতা রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গে সোমবার বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়ে ই-মেইল করেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কথিত নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে সিইসির পদত্যাগ, এসআইআর বন্ধ এবং ব্যালট পেপারে ভোট চালুর দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া। তবে প্রধান বিচারপতি তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি। তিনি জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আবেদন জানানো যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের পরও সোমবার পদযাত্রা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। বিরোধী দল, তরুণ সমাজ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি ‘ভয় পাব না’ স্লোগান সামনে আনেন। তবে পদযাত্রা শেষ পর্যন্ত কীভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ প্রত্যাখ্যানকে বিরোধীদের দাবির বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট বিষয় বিচারাধীন থাকায় তিনি প্রশাসনিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের স্মারকলিপি গ্রহণের বদলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ বিরোধীদের অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা বা সত্যতা নিয়ে এ সিদ্ধান্তে কোনো রায় দেওয়া হয়নি।
ধরপাকড়ের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
সিইসির পদত্যাগের দাবিতে শনিবার থেকে দিল্লিতে বিক্ষোভ করছে সিজেপি ও তাদের সমর্থকেরা। ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে সমাবেশের পরিকল্পনা ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে দিল্লিতে উড়োজাহাজ অবতরণের পর আটক করা হয়। তাঁদের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতা, শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও সাংবাদিকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করে পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আটকের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে; কোথাও প্রায় তিন হাজার, কোথাও সাত হাজারের বেশি মানুষের আটকের কথা বলা হয়েছে।
রোববার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে সিজেপির তিন নেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এক বছর শান্তি ও ভালো আচরণ বজায় রাখার শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, বিক্ষোভ না করার কোনো মুচলেকায় তাঁরা সই করেননি। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলন থামবে না এবং তাঁরা আবার রাস্তায় নামবেন।
মুক্তির পর সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘লড়াই সবে শুরু হয়েছে।’ জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। সৌরভ দাসও আন্দোলন শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেন। তাঁদের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচনী অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীদের অভিযোগ, সংশোধনের ফলে বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও বিরোধী সমর্থকদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপির বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা যাচাই করা যায়নি—এমন ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কারণেই তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য, সংশোধনের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন।
দিল্লিতে সমাবেশে বিধিনিষেধ
বিক্ষোভ ও সম্ভাব্য পদযাত্রাকে ঘিরে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ অনুমতি ছাড়া সমাবেশ ও প্রতিবাদ ঠেকাতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এসব ব্যবস্থার ফলে বিক্ষোভকারীদের চলাচল, সমাবেশের স্থান এবং জনপরিবহন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর আগে ১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঘিরে দিল্লি মেট্রোর একাধিক স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটার খবর প্রকাশিত হয়। রোববার কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে, মেট্রো ও রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
এদিকে বিরোধী জোটের পদযাত্রা এবং সিজেপির আন্দোলনের মধ্যে রাজধানীতে জননিরাপত্তা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক জোরালো হয়েছে। একদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি; অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের আটক, যন্তর মন্তরে সমাবেশের অনুমতি না পাওয়া এবং নেতাদের প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় বিরোধীরা সরকারের সমালোচনা করেছে। সিজেপি নেতারা দাবি করেছেন, শান্তি বজায় রাখার শর্তকে প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তাঁদের মতে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সাংবিধানিক অধিকার।
‘জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি’ অভিযোগ
দিল্লিতে গত কয়েক দিনের ঘটনাকে ভারতের ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন সিজেপি নেতা আশুতোষ রাঙ্কা। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী মত দমনে ব্যাপক আটক, চলাচলে বাধা এবং বিক্ষোভস্থলে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ফলে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। সৌরভ দাসও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ তুলেছেন।
সিজেপির আইনি সহায়তা বিভাগের প্রধান রত্না সিং পুলিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি এবং তাঁদের চলাফেরায় নজরদারির অভিযোগ করেছেন। সৌরভ দাসের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ গুরুদ্বার বাংলা সাহিবে প্রবেশের সময় শিখ ধর্মীয় রীতির প্রতিও যথাযথ সম্মান দেখায়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিজেপি সিজেপির আন্দোলনের সমালোচনা করেছে। বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, বিদেশি শক্তির নির্দেশে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিজেপি ভারতের ক্ষতি করতে চাইছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত সিজেপিকে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির ‘বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে, তবে নৈরাজ্য ছড়ানোর অধিকার কারও নেই।
এখন নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে
বিরোধী জোটের অভিযোগ এবং সিজেপির আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং সিইসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দিতে হবে। একই সঙ্গে তাঁরা ব্যালট পেপারে ভোট ফিরিয়ে আনার দাবিও তুলেছেন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় বিরোধী নেতাদের স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়েছে। তবে বিচারাধীন বিষয়ে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মঙ্গলবার শুনানির কথা রয়েছে বলে বার অ্যান্ড বেঞ্চের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিক্ষোভ, পুলিশের বিধিনিষেধ ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া—এই তিনটি বিষয় এখন একই বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা, প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পদক্ষেপের আইনগত ভিত্তি এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে আদালতে উপস্থাপিত তথ্য, সরকারি নথি ও স্বাধীন তদন্তের ওপর।