ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভ এবার জম্মু-কাশ্মীরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ডাকে শনিবার (১০ অক্টোবর) অঞ্চলটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে অংশ নেয় ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি), পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) ও অন্যান্য বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা।
একই সময়ে দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরোপের সমালোচনা করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি। তাঁরা দিল্লির পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিলের পর সেখানকার পরিস্থিতির তুলনা করেছেন।
শ্রীনগরে কংগ্রেসের কার্যালয়ে এনসি ও পিডিপির কয়েক ডজন নেতা-কর্মী সমবেত হন। তাঁদের মধ্যে নারীরাও ছিলেন। দলীয় পতাকা ও প্ল্যাকার্ড হাতে তাঁরা লাল চকের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী বাধা দেয়। বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ছবি ছিল। তাঁরা ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে সিইসির পদত্যাগ দাবি করেন।
শ্রীনগরের বাইরে মধ্য কাশ্মীরের গান্দেরবাল ও দক্ষিণাঞ্চলের অনন্তনাগেও বিরোধী জোটের শরিক দলগুলো যৌথভাবে বিক্ষোভ করে।
গান্দেরবালে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া গিয়াস আহমদ বলেন, ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিডিপি ও সিপিআই(এম)-এর নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছেন। তাঁদের দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে এবং তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। ভোটার তালিকায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী নেতাদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এই বিক্ষোভকারী।
দিল্লির পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা
দিল্লিতে বিরোধীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার খবর সামনে আসে। বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার পথ আটকে দেওয়ার মতো পদক্ষেপেরও অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানান জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। তিনি লেখেন, ‘কাশ্মীর মডেল দিল্লিতে রপ্তানি করা হয়েছে। নতুন দিল্লিকে স্বাগত, যে দিল্লি নতুন জম্মু-কাশ্মীরের আদলে তৈরি।’ তাঁর এই মন্তব্যকে দিল্লিতে বিক্ষোভ মোকাবিলায় নেওয়া কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার সমালোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৯ সালের আগস্টে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধিকাংশ বিধান কার্যত প্রত্যাহার করে। ওই সময় অঞ্চলটিতে যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। ওমর আবদুল্লাহর মন্তব্যে সেই সময়ের পরিস্থিতির সঙ্গে দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা উঠে এসেছে।
পিডিপি নেত্রী ও জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও দিল্লির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতি ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীরের পরিস্থিতির স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। তাঁর ভাষ্য, সে সময় মানুষকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল এবং পুরো অঞ্চল কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। মেহবুবা আরও বলেন, ওই সময় বিজেপি প্রকাশ্যে দাবি করেছিল, কেউ প্রতিবাদ করেনি। দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পরও একই ধরনের বক্তব্য সামনে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের যাতায়াত বাধাগ্রস্ত করা এবং ট্রেন চলাচল বন্ধের অভিযোগ তুলে মেহবুবা বলেন, যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রথমে বিক্ষোভ দমন করা হয়, পরে এমনভাবে তা অস্বীকার করা হয়, যেন কোনো প্রতিবাদই হয়নি। এভাবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে তুলে ধরা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দুই নেতার বক্তব্যে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক সামনে এসেছে।
তবে ভোটার তালিকায় জালিয়াতির অভিযোগ বিরোধী দলগুলোর দাবি। অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপির বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।